১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে গণহত্যা বিচারের দাবি, সরকারের প্রতি শফিকুর রহমানের প্রশ্ন

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে গণহত্যা বিচারের দাবি, সরকারের প্রতি শফিকুর রহমানের প্রশ্ন
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে গণহত্যা বিচারের দাবি, সরকারের প্রতি শফিকুর রহমানের প্রশ্ন
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্যাসিবাদী শাসনামলের ও জুলাই গণহত্যার বিচার চেয়েছেন। তিনি সরকারের প্রতি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ফেনী ও চট্টগ্রামে পথসভা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই কর্মসূচিতে ফ্যাসিবাদী শাসনামলের গণহত্যা এবং জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবি তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাস পার করলেও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ফেনীর মহীপালে আয়োজিত পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা কোনো দলীয় দাবি নিয়ে রাজপথে নামেননি। জনগণের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন এবং নতুন ফ্যাসিবাদের কবর দিতে আন্দোলনে নেমেছেন। কোনো চোখ রাঙানিকে তারা ভয় পান না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ তাদের গর্বের ঠিকানা, বজ্রপাত হলেও তারা জনগণের সাথেই থাকবেন। বর্তমান সরকার জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে এবং নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করছে। তিনি সরকারকে কিছু সময় দিয়েছেন, তবে এই সময় দীর্ঘ হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

চূড়ান্ত ডাক এলে জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তাদের লড়াই যুবকদের জন্য, কারণ যুবকরাই আগামী দিনে দেশের নেতৃত্ব দেবে। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেন, যেখানে সব ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।

চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান জানান, এই লংমার্চ সরকারকে সতর্ক করার জন্য আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সারসঙ্কট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবি বাস্তবায়িত না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে। তিনি বলেন, অপরাধী, চাঁদাবাজ, লুণ্ঠনকারী ও দুর্নীতিবাজরা শেষ পর্যন্ত হেরে যাবে।

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, দেশপ্রেমিক ১১ দলীয় ঐক্যের এটি প্রথম লংমার্চ, তবে পরবর্তী লংমার্চগুলো এমন নাও হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ছয় দফার একটি দাবিও ১১ দলের জন্য নয়, সবগুলোই দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থে। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, জনগণের সাথে করা ওয়াদা লঙ্ঘন করা হচ্ছে, এবং প্রয়োজনে তাদের আঙুল বাঁকা হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের গণরায় অস্বীকার করে জনগণের সাথে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায় আদায় করেই ছাড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে এবং এর সাথে ঈদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।

তিনি উল্লেখ করেন, আন্দোলন, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সূতিকাগার চট্টগ্রাম থেকেই নতুন এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হলো। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ পরিচালনা করবেন, কিন্তু প্রশাসক হিসেবে যাদের বসানো হয়েছে তারা কি নির্বাচিত প্রতিনিধি? তিনি আরও বলেন, অনির্বাচিত সরকারের সময় দেশের যে সঙ্কট ছিল, বর্তমানেও সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।

দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সঙ্কট রয়েছে এবং বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল নিয়ে মানুষের ভোগান্তি রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের লোকজন সন্ত্রাস, চুরি ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের মেয়াদ অনির্দিষ্টভাবে বহাল রাখাকে ফ্যাসিবাদী আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, পিলখানার হত্যাকাণ্ড, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের মৃত্যু এবং আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িতদের বিচার জনগণ চায়। তিনি এসব ঘটনার বিচার আদায় করে ছাড়ার অঙ্গীকার করেন।

পথসভায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। জনগণ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং তাদের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সংসদে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

রাজপথে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নিপীড়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ১১ দলের নেতাকর্মীদের ওপর আর কোনো হামলা হলে তা প্রতিহত করা হবে। তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না হলে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। ঢাকা লংমার্চ থেকে রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার এখনো হয়নি। তারা ফ্যাসিবাদ ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চান। তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকারের মুখপাত্র গণভোটকে অবৈধ বলে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অপমান করেছেন।

একই দিনে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হলেও কেবল গণভোট অবৈধ হতে পারে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে বলে তিনি দাবি করেন। মামুনুল হক আরও বলেন, বিএনপি বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার পথে এগোচ্ছে।

গণভোটের গণরায় বাতিলের চেষ্টা এবং জুলাই সনদ নস্যাৎ করার উদ্যোগ নেওয়া হলে জনগণ সরকারকে ‘লালকার্ড’ দেখাবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে বাকশালের চেয়েও খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে।

তিনি আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পথে পথে জনতার ঢল প্রমাণ করেছে, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারবে না।

গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের বহর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। লংমার্চের রুটে পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। মিরসরাইয়ে পথসভা শেষে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে লংমার্চের সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...