১৫ বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছে কিশোরী জুঁই, অর্থাভাবে বন্ধ চিকিৎসা
সম্পাদক৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · 2 ঘণ্টা আগে
১৫ বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছে কিশোরী জুঁই, অর্থাভাবে বন্ধ চিকিৎসা
নাটোরের বাগাতিপাড়ার জুঁই খাতুন সাত মাস বয়স থেকে কিডনি রোগে ভুগছে। ১৫ বছর ধরে চলা এই চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে পরিবারটি এখন নিঃস্ব, অর্থাভাবে তার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে।
নাটোরের বাগাতিপাড়ার জুঁই খাতুন নামের এক কিশোরী প্রায় ১৫ বছর ধরে জটিল কিডনি রোগে ভুগছে। সাত মাস বয়স থেকে তার এই অসুস্থতা শুরু হয়েছে। অর্থাভাবে প্রায় তিন মাস ধরে তার চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে।
জুঁই বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস (কুলপাড়া) গ্রামের দিনমজুর জুব্বার আলী ও রিনা বেগম দম্পতির মেজ মেয়ে। সে বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না এবং এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জুঁইয়ের শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়। প্রস্রাবের সমস্যা, পেট ফুলে থাকা, বয়স অনুযায়ী শারীরিক বৃদ্ধি না হওয়া, রাতে ঘুমাতে না পারা এবং শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতায় সে ভুগছে। প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে তার পেট আরও ফুলে যায়, তখন বসা, শোয়া বা ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
জুঁই ভাঙা কণ্ঠে জানিয়েছে, তার পেট ও পাশে ব্যথা করে এবং ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারে না। সে সুস্থ হয়ে আবার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে, ঘুরতে এবং নিয়মিত স্কুলে যেতে চায়। এজন্য কিশোরীটি সবার কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছে।
জুঁইয়ের মা রিনা বেগম বলেন, সাত মাস বয়স থেকেই তার মেয়ে অসুস্থ। তখন থেকেই পেট ফুলে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, চোখ-মুখ ফুলে যাওয়া এবং প্রস্রাবে বারবার সংক্রমণের সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার মূত্রনালিতে জটিল সমস্যা রয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিনা বেগম আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাদের সব সামর্থ্য শেষ হয়ে গেছে। অর্থের অভাবে প্রায় তিন মাস ধরে জুঁইয়ের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি করানোর মতো সামর্থ্যও তাদের নেই। তিনি মেয়েকে বাঁচাতে সমাজের হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন।
জুঁইয়ের বাবা জুব্বার আলী অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি নিজের সামান্য সম্পদও বিক্রি করেছেন। ঢাকা ও রাজশাহীর বিভিন্ন হাসপাতালে তিনি মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি এখন প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
জুঁইয়ের বড় মা ঝরণা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটিকে অসহ্য কষ্ট সহ্য করতে দেখছেন তারা। চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের যা কিছু ছিল, প্রায় সবই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে জুঁইয়ের পেট, চোখ ও মুখ ফুলে আছে। ব্যথা ও শ্বাসকষ্টে সে রাতে ঘুমাতে পারে না।
জুঁইয়ের চাচি লিপি খাতুন বলেন, ওর কষ্ট চোখে দেখা যায় না। রাতে ঘুমাতে পারে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তারা আত্মীয়স্বজন মিলে যতটা পেরেছেন সাহায্য করেছেন, কিন্তু এখন আর পারছেন না। চাচা শামিম বলেন, জুঁইয়ের চিকিৎসার জন্য পরিবারটি জমিজমা, গাছগাছালিসহ যা কিছু ছিল, তা বিক্রি করেছে। এখন তাদের আর কোনো সামর্থ্য নেই। তাই জুঁইয়ের চিকিৎসা চালিয়ে নিতে সমাজের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবর আলী বলেন, জুঁই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে সে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না। এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে জুঁইয়ের শ্রেণিকক্ষে ফেরার প্রত্যাশা করেন।
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন বলেন, জুঁইয়ের পরিবার অত্যন্ত অসচ্ছল। দীর্ঘদিন ধরে মেয়েটি গুরুতর অসুস্থ। তিনি যতটা সম্ভব পরিবারটিকে সহযোগিতা করেছেন। জুঁইয়ের চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক বলেন, নেফ্রোটিক সিনড্রোম একটি পরিচিত রোগ। রোগটির ধরন নির্ণয়ের জন্য বায়োপসি করা হয়। রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর চিকিৎসার ফলাফল নির্ভর করে। কম ক্ষতিকারক ধরনের হলে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে ক্ষতিকারক ধরন হলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
জুঁইয়ের পরিবার তার চিকিৎসা চালিয়ে নিতে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছে। সহায়তা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
মতামত (0)