৬ কোটি টাকার সেতুর সংযোগ সড়ক ধসে পড়লো ২ মাসে

৬ কোটি টাকার সেতুর সংযোগ সড়ক ধসে পড়লো ২ মাসে
৬ কোটি টাকার সেতুর সংযোগ সড়ক ধসে পড়লো ২ মাসে
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি গার্ডার ব্রিজের দুই পাশের সংযোগ সড়ক উদ্বোধনের মাত্র দুই মাসের মাথায় ধসে পড়েছে, যা নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় একটি নবনির্মিত গার্ডার ব্রিজের দুই পাশের সংযোগ সড়ক উদ্বোধনের মাত্র দুই মাসের মাথায় ধসে পড়েছে। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ব্রিজটি চার বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণাধীন ছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতের হালকা বৃষ্টিতেই সেতুর প্রায় ২০০ মিটার সংযোগ সড়ক ধসে যায়, যদিও কোনো টানা বৃষ্টি হয়নি।

এই ঘটনায় প্রতিদিন নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে এবং স্থানীয় মানুষ ও যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। বোদা উপজেলার ঝলই শালশিড়ি ইউনিয়নের ধরধরা এলাকায় টাঙ্গন নদের ওপর নির্মিত এই ব্রিজের সরেজমিন পরিদর্শনে এমন চিত্র দেখা গেছে। এলাকাবাসী দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগ সড়ক সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ব্রিজ সংলগ্ন টাঙ্গন নদ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে সংযোগ সড়ক ভরাটের অভিযোগও ওঠে। এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল।

স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রিয়নাথসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নদ থেকে বালু তুলে সড়ক ভরাটের সময় তাদের বলা হয়েছিল যে এতে রাস্তা আরও মজবুত ও টেকসই হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এলজিইডির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন। তাদের দাবি, নদ থেকে তোলা নরম বালুর ওপর পর্যাপ্তভাবে মাটি ও অন্যান্য উপকরণ না দিয়ে দ্রুত হেরিংবোন সড়ক (এইচবিবি) নির্মাণ করার কারণেই এখন তা ধসে পড়ছে।

এর আগে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগের মুখে তা আর উদ্বোধন করা হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ সেসময় এলাকাবাসীর অভিযোগ শুনে কাজের দুরবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এলজিইডির জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশও দেন। ঐ ঘটনার ভিডিও ও খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ চলার পর মাত্র দুই মাস আগে সড়কটি মানুষের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে সামান্য বৃষ্টিতে সড়ক ধসে পড়া নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তার মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এলজিইডির তদারকি যথাযথ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

তবে সড়ক ধসে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে এলজিইডি। বোদা উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন বলেন, "সেতুর দুই দিকের প্রায় ২০০ মিটারে এইচবিবি রাস্তাটি বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করতে সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "এত অল্প সময়ের ব্যবধানে রাস্তাটি এভাবে ধসে যাবে, তা আমরাও ভাবিনি। নিম্নমানের কাজের পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের গাফিলতি ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"

তিনি জানান, ব্রিজের বোদা উপজেলার ধরধরা ও আটোয়ারী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া অংশের সংযোগ সড়কটি এইচবিবি পরিবর্তে স্থায়ীভাবে কার্পেটিং করার জন্য নতুন বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পঞ্চগড় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম বলেন, "বিষয়টি জানার পর পরই আমরা সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছি।"

তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখনো চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়নি। শফিউল ইসলাম বলেন, "তদন্তে যদি ঠিকাদারের গাফিলতি বা কাজের নিম্নমানের প্রমাণ মেলে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস করপোরেশন। ৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জনগুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক ব্যবহারের দুই মাসের মধ্যেই ধসে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, সাময়িক সংস্কার নয়, নির্মাণকাজের মান যাচাই করে ত্রুটির স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

পঞ্চগড় জেলার দুই উপজেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য টাঙ্গন নদের ওপর এই সংযোগ ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। এই ব্রিজ দিয়ে বোদা উপজেলার ধরধরা ও আটোয়ারী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। তবে নির্মাণ শেষ হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই ব্রিজটির দুই পাশের সংযোগ সড়ক ধসে পড়ায় এর উভয় পাশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে যানবাহন ও পথচারীদের চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...