৭ নেতার মৃত্যুদণ্ড, ৫ জনের অর্ধেক সম্পদ বাজেয়াপ্ত

৭ নেতার মৃত্যুদণ্ড, ৫ জনের অর্ধেক সম্পদ বাজেয়াপ্ত
৭ নেতার মৃত্যুদণ্ড, ৫ জনের অর্ধেক সম্পদ বাজেয়াপ্ত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৭ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই দণ্ড ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা শীর্ষ নেতৃত্বের দায়ের জন্য দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দণ্ডিত পাঁচ নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। ট্রাইব্যুনাল নির্দেশ দিয়েছেন, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খানকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন।

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এই সাত আসামিই পলাতক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে, ১০ মাস পর আরেকটি মামলায় ওবায়দুল কাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। গতকালের রায়টি এই ধরনের অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায়।

দুটি ট্রাইব্যুনালের মোট সাতটি রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ মোট ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে রয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এজলাসে আসেন। কয়েকটি মামলার শুনানি শেষে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী রায় ঘোষণার শুরুতে এই মামলার অনেক কাগজ পড়তে ও রায় দিতে কষ্ট হওয়ার কথা জানান। তিনি প্রসিকিউশন, সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেন, রায়ের কপি ৫৫০ পৃষ্ঠার বেশি এবং পৃষ্ঠা আরও বাড়বে। পুরো রায় ইংরেজিতে হলেও সহজে বোঝার জন্য এর কিছু অংশ বাংলায় আনা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আসামিরা উপস্থিত থাকলে পুরো রায় পড়ে শোনানো হতো। এরপর তিনি আসামিদের সাজার বিস্তারিত ঘোষণা করেন।

এই মামলার রায়ে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে চারটি করে অভিযোগ আনা হয়েছে। ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের সব কটিতেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। চারটি অভিযোগের তিনটিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং একটিতে (দুই নম্বর অভিযোগ) আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথন হয়। তখন কাদের সাদ্দামকে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’ ১৫ জুলাই ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে বক্তব্য দেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে উসকে দেন।

ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মুরাদপুর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুককে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের নেতা-কর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নির্দেশ দেন। পরদিন ১৮ জুলাই ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দেন। ১৯ জুলাই গণভবনে দলীয় ও ১৪ দলের প্রধানদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।’

ওবায়দুল কাদেরের এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ১৮ জুলাই শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনসহ তিনজন, ১৯ জুলাই আসিফ ইকবালসহ ৩০ জন এবং ২০ জুলাই সিফাত হোসেন, মহাখালী এলাকায় ছয়জনসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করে। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকে রুখে দিতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন। তাঁর এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...