বেনজীরকে ফেরাতে শৈথিল্য নয়, সংসদে সরকারের কঠোর অবস্থান

বেনজীরকে ফেরাতে শৈথিল্য নয়, সংসদে সরকারের কঠোর অবস্থান
বেনজীরকে ফেরাতে শৈথিল্য নয়, সংসদে সরকারের কঠোর অবস্থান
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ বিদেশে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার কোনো শৈথিল্য দেখাবে না বলে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে। বিরোধী দল বেনজীরকে ফেরাতে বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ বিদেশে পলাতক কোনো আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার কোনো শৈথিল্য দেখাবে না। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এই আহ্বান জানানো হয়। বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে বিরোধী দলের আনা একটি প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই কথা বলেন।

অন্যদিকে, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের সত্যিকার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল। তারা বেনজীরসহ বিদেশে পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাবটি গৃহীত হয়, যা সাধারণত বিরল।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম এই প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপন করেন। গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ কীভাবে দুবাইতে জামিন পেলেন, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাতীয় সংসদকে অবহিত করতে হবে। এই অপরাধীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সে সম্পর্কে মীর আহমাদ বিন কাসেম ও সংসদের প্রতিটি সদস্যকে যথাশিগগির অবহিত করতে হবে।

প্রস্তাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চারটি বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যর্পণ অনুরোধসহ নেওয়া পদক্ষেপের পূর্ণ বিবরণ এবং নথিতে কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল কি না ও দায়ীদের শনাক্তকরণ। এছাড়া সরকারি চাকরিতে থাকাকালে ছয়টি দেশের পাসপোর্ট নেওয়ার তদন্তের অগ্রগতি এবং বেনজীরকে সেন্ট লুসিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও দেশে-বিদেশে তাঁর অবৈধ সম্পদ জব্দের পদক্ষেপ সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেনজীরসহ বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখাবে না। তিনি জানান, বেনজীরের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ২০০৯ সাল থেকে গুম-খুন-নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। বেনজীর আহমদকে ‘সিরিয়াল কিলার’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এই নির্যাতনের হাতিয়ার ও যে দুষ্কৃতকারীরা ছিল, তার মধ্যে শেখ হাসিনার পর বেনজীরকে ‘নাম্বার ওয়ান’ বলা যায়। তিনি বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরে বিরোধী দলের সহযোগিতা কামনা করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ছেড়ে সেন্ট লুসিয়ায় গেছেন—এমন খবরের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, কাউকে ধরে ফাঁসি দেওয়া যায় না এবং জুডিশিয়াল প্রসেসটা একটু লম্বা হয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং জুডিশিয়াল প্রসেসের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ জুন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি), আবুধাবি বাংলাদেশকে জানায়, বেনজীর সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

ইউএইর আইনে ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর কথা থাকলেও বাংলাদেশ মাত্র চার দিনের মধ্যে, ২০২৬ সালের ১৬ জুন কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তাই দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার নীতির ভিত্তিতে প্রক্রিয়াটি চলছে।

ইউএইর চাহিদা অনুযায়ী, অতিরিক্ত নথিপত্র ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট পাঠানো হয়েছে। পরে আরও আইনি ব্যাখ্যা চাওয়া হলে ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। এ জন্য ইউএইতে একটি ল ফার্মও নিয়োগ করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, সম্ভবত গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যে কুখ্যাত আইজিপি বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাত ছেড়ে গেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা সম্পর্কে তাঁরা অবগত নন। এর অর্থ হলো, বেনজীর এখনো সংযুক্ত আরব আমিরাতেই রয়েছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে বিবেচনার সুযোগ আছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান মন্তব্য করেন, গুমের মতো ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে বেনজীর আহমেদরাই পরিচিত করেছেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, বেনজীরের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু ফলাফল পাওয়া যায়নি। তিনি একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব করে বলেন, বেনজীরসহ অন্য পলাতক ফ্যাসিস্টদের ইস্যু সমাধান করার কাজ করবে এই সেল।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...