ভারতে সস্তা প্যাকেটজাত খাদ্যে নির্ভরশীলতা ও স্বাস্থ্য সতর্কতার বিতর্ক

ভারতে সস্তা প্যাকেটজাত খাদ্যে নির্ভরশীলতা ও স্বাস্থ্য সতর্কতার বিতর্ক
ভারতে সস্তা প্যাকেটজাত খাদ্যে নির্ভরশীলতা ও স্বাস্থ্য সতর্কতার বিতর্ক
ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। কম আয়ের কারণে ভারতীয়রা সস্তা খাবারে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কঠোর সতর্কতামূলক লেবেলের প্রস্তাব উঠেছে।

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। ছোট দোকানেও ম্যাগি ইনস্ট্যান্ট নুডলস সহজলভ্য। কিছু খাদ্যপণ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কতামূলক লেবেল ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের অন্য বাজারে একই ব্র্যান্ডের তুলনামূলক পুষ্টিকর সংস্করণ বিক্রি হলেও ভারত কীভাবে সস্তা প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীল হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতে পারিবারিক আয় বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে নেসলে মালিকানাধীন ম্যাগি ইনস্ট্যান্ট নুডলস এবং কোকাকোলা কোম্পানির থামস আপের মতো সস্তা খাবারের বড় ভোক্তা ভারতীয়রা। এর ফলে বড় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশাল একটি বাজার পেয়েছে। একই সঙ্গে অন্য অনেক দেশে তারা যেসব খাদ্যমান অনুসরণ করে, ভারতে সেগুলো প্রয়োগের চাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

তবে পরিস্থিতি এখন বদলাতে শুরু করেছে। ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা ও মান কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই) গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, কোনো খাদ্যপণ্যে সরকারের নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি যোগ করা চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে প্যাকেটে আরও কঠোর লাল সতর্কতামূলক লেবেল চালু করা হতে পারে। ধাপে ধাপে এই লেবেল চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা প্রশ্ন তোলার পর এফএসএসএআই এই অবস্থান জানিয়েছে।

ভারতে অতিরিক্ত চিনির ব্যবহার বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বে মোট ডায়াবেটিস রোগীর প্রায় এক-চতুর্থাংশই ভারতে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর জন্য প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহারকেও আংশিকভাবে দায়ী করেছেন। ডেনমার্কের ওষুধ কোম্পানি নোভো নরডিস্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১০ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। প্রিডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৩ কোটি ৬০ লাখ।

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারের বাজার গত বছর ছিল ১২৯ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। চলতি বছর সেটি বেড়ে ১৩৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইএমএআরসি গ্রুপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৪ সালে এই বাজার ২৩৮ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ভারতের পরিবারগুলো ও রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ৬০০ কোটি বার ম্যাগির দুই মিনিটে তৈরি করা যায় এমন মসলাযুক্ত নুডলস খাওয়া হয়। সুইজারল্যান্ডের খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠান নেসলে এই নুডলস তৈরি করে। ভারতে প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলসের ব্র্যান্ড হিসেবে ম্যাগি বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে। তখন সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করা মা ও শিশুদের লক্ষ্য করে পণ্যটির প্রচার চালানো হয়।

বিজ্ঞাপনে স্কুল বা খেলাধুলা শেষে শিশুরা ম্যাগি নুডলস খাচ্ছে—এমন চিত্র তুলে ধরা হতো। বিজ্ঞাপনের বার্তা ছিল, ‘মা, আমার ক্ষুধা লেগেছে।’ ম্যাগির সাফল্য ভারতে নেসলের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে। বর্তমানে ভারত নেসলের সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা অঞ্চল।

ভারতে ম্যাগির সব ধরনের নুডলসেই পাম তেল ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া ম্যাগির অনেক সংস্করণে তুলনামূলক বেশি দামের সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি হওয়া কিটক্যাটের তুলনায় ভারতের কিটক্যাটে কোকোর পরিমাণ কম।

ইউনিলিভারের ভারতের সাবেক বিপণন কর্মকর্তা শশাঙ্ক মেহতা বলেন, ‘এটি জাতীয় গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—কেন ভারতকে কম দেওয়া হবে? প্রতিষ্ঠানগুলো কেন আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে যে আমি ভালো উপাদান কিনতে পারব না?’ উন্নত মানের উপাদান ব্যবহার করলে খরচও বাড়ে। এতে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে, যা দাম নিয়ে সচেতন বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে বলে নেসলের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কথা বলেন।

নেসলে এক বিবৃতিতে বলেছে, ভোক্তাদের প্রত্যাশা, স্থানীয় স্বাদের পছন্দ, খাদ্যসংস্কৃতি, উপাদানের প্রাপ্যতা ও আবহাওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাদের পণ্যের উপাদান ও রেসিপি নির্ধারণ করা হয়। নেসলে আরও বলেছে, রেসিপিতে ভিন্নতা থাকলেও পণ্যের মানে তার প্রভাব পড়ে না। বিশ্বজুড়ে কিটক্যাটের ১০টির বেশি আঞ্চলিক রেসিপি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের সব খাদ্যনিরাপত্তা আইন মেনে চলে এবং প্যাকেটে উপাদানগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

চিনি, লবণ ও চর্বির মাত্রা বেশি হলে তা বোঝাতে খাবারের প্যাকেটের সামনের অংশে সতর্কতামূলক লেবেল দেওয়ার বিষয়টি ভারতে কয়েক বছর ধরেই আলোচিত হচ্ছে। চিলি ও মেক্সিকোর মতো দেশে এমন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরোধিতার কারণে ভারতে বিষয়টি এগোয়নি। বিশেষ করে অনেক প্রচলিত ভারতীয় খাবারে চিনি বা চর্বির পরিমাণ বেশি থাকায় ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। চিলিতে ২০১৬ সালে খাদ্যপণ্যের লেবেল দেওয়ার আইন চালু হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...