ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্তের মুখে বাংলাদেশের পিইটি ফিল্ম রপ্তানি

ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্তের মুখে বাংলাদেশের পিইটি ফিল্ম রপ্তানি
ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্তের মুখে বাংলাদেশের পিইটি ফিল্ম রপ্তানি
বাংলাদেশ থেকে ভারতে পিইটি ফিল্ম রপ্তানির বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করেছে ভারত। আগামী ৬ আগস্ট এ বিষয়ে একটি ভার্চ্যুয়াল শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) ফিল্মের বিরুদ্ধে অ্যান্টি–ডাম্পিং তদন্ত শুরু করেছে ভারত। এই পণ্যটি মূলত খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী ও শিল্পপণ্যের মোড়ক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিদপ্তর (ডিজিটিআর) এই তদন্ত শুরু করেছে।

ডিজিটিআর ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সংস্থা। ডিজিটিআর আগামী ৬ আগস্ট ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে এই তদন্তের অংশ হিসেবে একটি মৌখিক শুনানির আয়োজন করেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

১৩ জুলাই ডিজিটিআর এক চিঠিতে এই শুনানির আয়োজনের কথা জানিয়েছে। চিঠিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি চীন ও থাইল্যান্ড থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পিইটি ফিল্মের কথাও উল্লেখ আছে। ভারতীয় উৎপাদকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে এই শুনানির আয়োজন করা হয়েছে।

ভারতীয় উৎপাদকরা অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে ডাম্পিং মূল্যে পিইটি ফিল্ম ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। তারা দাবি করেছেন, এই কারণে ভারতীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এই পণ্যের ওপর অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা উচিত।

অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক হলো এক ধরনের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক। কোনো দেশের কর্তৃপক্ষ যখন মনে করে যে, বিদেশি প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য বিক্রি করে তাদের দেশের শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তখন এই শুল্ক আরোপ করা হয়।

তদন্তের এই পর্যায়ে বাংলাদেশের রপ্তানিকারক, ভারতীয় উৎপাদক, আমদানিকারক ও অন্যান্য অংশীজনেরা নিজেদের অবস্থান ও যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেডের পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনকে পক্ষ করা হয়েছে। এছাড়া ভারতের আবেদনকারী তিন প্রতিষ্ঠান—চিরিপাল পলি ফিল্মস লিমিটেড, ইস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ভ্যাকমেট ইন্ডিয়া লিমিটেডও এই প্রক্রিয়ার অংশ।

ভারতের পাঠানো চিঠিতে শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য কিছু নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আগেই প্রতিষ্ঠানের নাম, দেশের নাম, দেশের কোড নম্বর, ই–মেইল ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, অফিসের নম্বর ও অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তা বা আইনজীবীদের পরিচয় জমা দিতে হবে। শুনানিতে উপস্থাপিত বক্তব্য পরবর্তী সময়ে লিখিত আকারেও দাখিল করতে হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই তদন্তকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। কারণ, পিইটি ফিল্ম দেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভারত এই পণ্যের একটি বড় বাজার।

ভারতীয় উৎপাদকদের অভিযোগের ভিত্তিতেই ডিজিটিআর অ্যান্টি–ডাম্পিং তদন্ত শুরু করেছে। তবে তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বর্তমান শুনানির উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ গ্রহণ করা।

প্রথমে মৌখিক শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এরপর লিখিত বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য–উপাত্ত পর্যালোচনা করে তদন্তের পরবর্তী ধাপগুলো এগিয়ে যাবে। অ্যান্টি–ডাম্পিং তদন্তের ক্ষেত্রে মৌখিক শুনানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

এই পর্যায়ে অংশীজনদের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ একটি চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ভারত সরকার প্রয়োজন মনে করলে অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারে। আবার অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ না পেলে তদন্তও শেষ করে দিতে পারে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির গত সোমবার জানান, তারা পিইটি ফিল্মের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করবেন। তিনি ভারত সরকারকে এর ওপর অ্যান্টি–ডাম্পিং শুল্ক আরোপ না করার অনুরোধ করবেন বলেও জানান। এই অনুরোধ শিগগিরই করা হবে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে পিইটি ফিল্মের অন্যতম রপ্তানিকারক হলো আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেড। এটি আকিজ বশির গ্রুপের একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালে এটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত এই কারখানায় পিইটি ফিল্ম তৈরি হয়, যা মূলত প্যাকেজিং–শিল্পে ব্যবহৃত প্লাস্টিক ফিল্ম। বর্তমানে এটি দেশের একমাত্র বড় উৎপাদক এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এই পণ্য রপ্তানি করে।

পিইটি ফিল্মের পাশাপাশি কোম্পানিটি বাইঅ্যাক্সিয়ালি ওরিয়েন্টেড পলিপ্রোপিলিন (বিওপিপি), কাস্ট পলিপ্রোপিলিন (সিপিপি) ও স্ট্রেস ফিল্ম উৎপাদন করে। কোম্পানিটি দাবি করেছে, বছরে প্রায় ১০ হাজার টন পিইটি ফিল্ম রপ্তানি করা হয়। বাকি উৎপাদন দেশের বাজারে বিক্রি হয়।

প্রতিষ্ঠানের যাত্রার সময় বছরে ৪২ হাজার টনের বেশি উৎপাদন সক্ষমতার কথা জানানো হয়েছিল। আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেডের অন্যতম কর্ণধার শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, তাদের রপ্তানি বাজারভিত্তিক এবং কোনো ডাম্পিং হয়নি। শুনানিতে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...