ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ওম্যান আননোন’ স্বর্ণসিংহ জয়, ‘নাজা’র রেকর্ড অভ্যর্থনা

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ওম্যান আননোন’ স্বর্ণসিংহ জয়, ‘নাজা’র রেকর্ড অভ্যর্থনা
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ওম্যান আননোন’ স্বর্ণসিংহ জয়, ‘নাজা’র রেকর্ড অভ্যর্থনা
৮৩তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ওম্যান আননোন’ স্বর্ণসিংহ জিতেছে। লি চ্যাং-দংয়ের ‘পসিবল লাভ’ গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার পেয়েছে এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে নির্মিত ‘নাজা’ বিশেষ জুরি পুরস্কারের পাশাপাশি রেকর্ড অভ্যর্থনা পেয়েছে।

৮৩তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণসিংহ (গোল্ডেন লায়ন) জিতেছে ডেনিশ সিনেমা ‘ওম্যান আননোন’। গত শনিবার রাতে উৎসবের সমাপনী দিনে মিসরীয়-ডেনিশ নির্মাতা মে এল-তুখির ছবিটি এই পুরস্কার অর্জন করে। এর মাধ্যমে মে এল-তুখি অষ্টম নারী পরিচালক হিসেবে ভেনিসের স্বর্ণসিংহ জিতলেন।

ছবিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেনমার্ক নাৎসি জার্মানির দখলমুক্ত হওয়ার ঠিক পরের পটভূমি নিয়ে নির্মিত। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র মেরি, এক তরুণ গৃহকর্মী যিনি ধনী ব্যবসায়ী ক্রিশ্চিয়ানের বাসায় কাজ করেন। মেরির এক গোপন অতীত রয়েছে যেখানে যুদ্ধের সময় তিনি এক জার্মান সেনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, যা তার জীবনে লজ্জা, অপরাধবোধ ও আতঙ্কের উৎস হয়ে ওঠে। সমালোচকেরা ছবির এই গল্পকে আলফ্রেড হিচককের ‘রেবেকা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।

স্বর্ণসিংহ হাতে নিয়ে মে এল-তুখি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি উৎসবের প্রধান জুরি ম্যাগি গিলেনহালকে ধন্যবাদ জানান, যিনি উৎসবের শুরুতে চলচ্চিত্রে নারী নির্মাতাদের কম উপস্থিতি নিয়ে কথা বলেছিলেন। এবারের প্রতিযোগিতা বিভাগে ‘ওম্যান আননোন’ ছিল একমাত্র ছবি, যেটি একজন নারী নির্মাতা পরিচালনা করেছেন।

তুখি বলেন, ছবিটি নির্মাণ করতে তাকে আর্থিক ও মানসিক—সব দিক থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ইতিহাসের ‘অজানা নারীদের’ সামনে নিয়ে আসার তাগিদ তাকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ছবিটি নির্মাণ করতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘণ্টা কাজ করেছেন এবং নিজের সঞ্চয়ের অর্থও ব্যয় করেছেন।

এবারের উৎসবে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার পেয়েছে লি চ্যাং-দংয়ের ‘পসিবল লাভ’। দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান এই নির্মাতা ২৪ বছর পর ভেনিসে ফিরে এই সম্মান অর্জন করেন। অসুখী এক দম্পতির জীবনে এক তথ্যচিত্র নির্মাতা ও তাঁর ধনী স্বামী জড়িয়ে পড়ার গল্প নিয়ে ছবিটি নির্মিত।

ছবিটি সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও শোষণের জটিল সমীকরণ তুলে ধরে উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে। এটি এবার অস্কারের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করবে। পুরস্কার গ্রহণের সময় লি চ্যাং-দং বলেন, এই সম্মান তার কাছে বিশেষভাবে মূল্যবান এবং ২৪ বছর পর তাকে আবার ভেনিসে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য উৎসব কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

লি চ্যাং-দং আরও বলেন, অনেক মানুষের ধৈর্য আর দীর্ঘ অপেক্ষা না থাকলে হয়তো সিনেমাটি কখনোই তৈরি হতো না। নেটফ্লিক্স ছবিটির আন্তর্জাতিক পরিবেশনার দায়িত্বে রয়েছে। ছবিটি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেক্ষাগৃহে ২৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাবে এবং বিশ্বজুড়ে নেটফ্লিক্সে ৬ নভেম্বর থেকে দেখা যাবে।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’ বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছে। ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোরের এই ছবিটি পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি ভেনিসে অভ্যর্থনার নতুন রেকর্ড গড়েছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর ভেনিসে ‘নাজা’র প্রিমিয়ারের পর দর্শকেরা প্রায় ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে করতালি দেন, যা ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে দীর্ঘতম স্ট্যান্ডিং ওভেশন। বিশেষ জুরি পুরস্কার হাতে নিয়ে আব্রাহাম বলেন, ছবিটি নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের আক্রমণ এবং ছবিটি না দেখেই সেটিকে অস্বীকার করার বিষয়টি মোকাবিলা করা তার জন্য সহজ ছিল না।

আব্রাহাম বলেন, এই উৎসব শুরুর পর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই গাজায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। তার মতে, গাজায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি একটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার অংশ। তিনি আরও বলেন, কোনো অপরাধ অস্বীকার করাই সেই অপরাধকে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়, সে কারণেই তিনি চান ইসরায়েলিরা ‘নাজা’ দেখুন।

প্রায় তিন বছর ধরে অনুসন্ধান করে ৮০ মিনিটের ‘নাজা’ তথ্যচিত্রটি তৈরি হয়েছে। ছবিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগের ২৪ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, সেনা এবং অভ্যন্তরীণ সূত্রের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে; নিরাপত্তার কারণে তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। নির্মাতারা ছবিতে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে বিপুলসংখ্যক লক্ষ্য দ্রুত শনাক্ত ও হামলার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, তা দেখাতে চেয়েছেন। ছবির নামটিও ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় প্রচলিত একটি সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে এসেছে, যার মাধ্যমে কোনো বিমান হামলাকে বোঝানো হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...