চোখের সামনে কালো ছায়া দেখা: রোগ ও প্রতিকার

চোখের সামনে কালো ছায়া দেখা: রোগ ও প্রতিকার
চোখের সামনে কালো ছায়া দেখা: রোগ ও প্রতিকার
চোখের সামনে কালো ও গোল ছায়া দেখা সেন্ট্রাল সেরাস রেটিনোপ্যাথি রোগের লক্ষণ হতে পারে। এটি চোখের সংবেদনশীল রেটিনায় জলীয় পদার্থ জমার কারণে ঘটে।

চোখের সামনে হঠাৎ কালো এবং গোল ছায়া দেখতে পাওয়া একটি নির্দিষ্ট রোগের লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় আশপাশের সবকিছু পরিষ্কার থাকলেও চোখের দৃষ্টিপথে এমন ঝাপসা কালো অংশ ভেসে ওঠে। চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ফেকো সার্জন ডা. আহসান কবির এই অবস্থাকে সেন্ট্রাল সেরাস কোরিও রেটিনোপ্যাথি অথবা সেন্ট্রাল সেরাস রেটিনোপ্যাথি (সিএসসিআর বা সিএসআর) নামে উল্লেখ করেছেন।

এই রোগটি সম্পর্কে জানতে হলে চোখের ভেতরের একটি বিশেষ অংশ সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। চোখে দেখার পর্দা বা রেটিনার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কেন্দ্রবিন্দু রয়েছে, যা ‘ম্যাকুলা’ নামে পরিচিত। ম্যাকুলার মাঝখানে আরও একটি ক্ষুদ্র সংবেদনশীল অংশ থাকে, যার নাম ‘ফোভিয়া’। যেকোনো বস্তুকে স্পষ্টভাবে দেখার জন্য চোখের এই দুটি অংশের সুস্থ থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আমরা যা দেখি, তার আকৃতি, প্রকৃতি এবং রং নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি ‘কোন’ নামের বিশেষ কোষ দ্বারা গঠিত। চোখের এই সংবেদনশীল অংশের চারপাশে অসংখ্য ছোট ছোট রক্তবাহী শিরা রয়েছে, যা রেটিনার কার্যকারিতায় সাহায্য করে।

যদি এই রক্তবাহী শিরাগুলো থেকে রক্তের জলীয় অংশ কোনোভাবে লিক করে এবং রেটিনার কোষগুলোতে জমা হতে শুরু করে, তখন দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। এই জলীয় পদার্থ জমার কারণে ‘ম্যাকুলা’ অংশের কোষগুলো ফুলে ওঠে, যার ফলে রেটিনা তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে কিছুটা উঠে আসে এবং দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত সমস্যার সৃষ্টি হয়।

এই রোগের প্রধান এবং একমাত্র লক্ষণ হলো যন্ত্রণাবিহীন ঝাপসা কালো গোল ছায়া দেখা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যা একটি চোখেই বেশি দেখা যায়, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি দুটি চোখেই একই সময়ে বা ভিন্ন সময়ে দেখা দিতে পারে। এটি রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

রোগটি কেন হয়, তার প্রাথমিক কারণ এখনো সম্পূর্ণরূপে জানা যায়নি। তবে এর সঙ্গে কিছু আনুষঙ্গিক কারণ বা ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। হঠাৎ করে অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব অর্থাৎ অনিদ্রা এই রোগের অন্যতম কারণ হতে পারে।

এছাড়াও, দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন করা এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপানও সেন্ট্রাল সেরাস রেটিনোপ্যাথির কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।

ডা. আহসান কবির পরামর্শ দিয়েছেন যে, রোগীকে প্রথমে তার রোগ সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে হবে। তাকে জানতে হবে যে চোখের সংবেদনশীল এলাকায় জলীয় পদার্থ বা তরল জমেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, মাটিতে পানি জমে থাকলে যেমন আস্তে আস্তে তা শুকিয়ে যায়, তেমনি নতুন করে যদি কোনো শিরা থেকে রক্তরস লিক না করে, তাহলে জমে থাকা পানিও ধীরে ধীরে আপনা-আপনিই শুকিয়ে যায়। তাই এই পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

যেহেতু হঠাৎ দুশ্চিন্তা এই রোগের একটি প্রধান কারণ, তাই রোগীকে অবশ্যই তার দুশ্চিন্তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।

এছাড়াও, কিছু প্রদাহ নিরোধক চোখের ড্রপ ব্যবহার, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, তাজা ফলমূল খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন নয়। তবে এই সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে দুই মাস পর্যন্তও সময় লাগতে পারে।

যদি রোগীর পক্ষে এই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা বা অস্বস্তি সহ্য করা কঠিন মনে হয়, তাহলে কিছু উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে চোখের অ্যানজিওগ্রাফি এবং ওসিটি (অপটিক্যাল কোহেরেন্স টোমোগ্রাফি) পরীক্ষার মাধ্যমে লিক হওয়া এলাকাটি নির্ধারণ করা হয়।

লিক হওয়া এলাকা চিহ্নিত করার পর স্বল্প তাপের লেজার চিকিৎসা প্রয়োগ করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিভিইজিএফ (Anti-VEGF) ইনজেকশনও এই রোগের চিকিৎসায় কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, যা রেটিনার ফোলা কমাতে সাহায্য করে।

চোখে শিরা লিক করে পানি জমা সেরে যাওয়ার পরেও ভবিষ্যতে এই সমস্যা আবার দেখা দিতে পারে। তাই রোগীকে এই পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ভবিষ্যতে এই সমস্যা এড়াতে দুশ্চিন্তা কমানো এবং চাপমুক্ত জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এই সমস্যাটি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই, তবে এটিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

মনে রাখতে হবে যে, এটি চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকাকে আক্রান্ত করে। সঠিক সময়ে এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা না নিলে অনেক সময় ভবিষ্যতে দৃষ্টির স্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা রোগীর জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...