ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধে হিমঘরে মরদেহ, আট দিন পর দাফন

ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধে হিমঘরে মরদেহ, আট দিন পর দাফন
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধে হিমঘরে মরদেহ, আট দিন পর দাফন
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার টানাপোড়েনের জেরে গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তির মরদেহ আট দিন ধরে হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে ছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশে রোববার রাতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

শুভ চন্দ্র দাস, যিনি মো. বিল্লাল নামেও পরিচিত ছিলেন, তাঁর মরদেহ অবশেষে নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার মধ্যে দীর্ঘ আট দিন ধরে টানাপোড়েন চলছিল। এই বিরোধের কারণে মৃত্যুর পরও তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে ছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর রোববার রাতে এই দাফন সম্পন্ন হয়।

শুভ চন্দ্র দাসকে গত ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। নিহত শুভ চন্দ্র দাসের বয়স ছিল ৩২ বছর। তাঁর মা, স্ত্রী ও ভাই চেয়েছিলেন ইসলামিক রীতি অনুযায়ী তাঁর দাফন হোক। তবে, তাঁর বাবা হিন্দুধর্মীয় রীতিতে সৎকার করার দাবি জানান।

ধর্মীয় পরিচয়ের এই বিরোধ উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় আট দিন ধরে মরদেহ হিমঘরে ছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে এই টানাপোড়েনের অবসান ঘটে। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে এনে জানাজা শেষে শুভর মরদেহ দাফন করা হয়।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে শুভর দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে তাঁর মরদেহ নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম। পুলিশের একটি দল এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। পরে মরদেহ তাঁর স্ত্রী জ্যোতি আক্তারসহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শুভ চন্দ্র দাসের শেষবিদায়ের সময় তাঁর মা আয়েশা আক্তার, স্ত্রী জ্যোতি আক্তার, দুই বছর বয়সী মেয়ে সুমাইয়া সোহানা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, তাঁর ভাই ইব্রাহিম এবং বোনজামাই মো. সেলিমসহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজনও সেখানে ছিলেন। জানাজা ও দাফনের স্থানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও ডিবি পুলিশের সদস্য মোতায়েন ছিল।

মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর এক আবেগঘন দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাকে কাঁদতে দেখে ছোট্ট সুমাইয়াও বাবার জন্য কাঁদছিল। বাবার হারানোর অর্থ বোঝার বয়স না হলেও মায়ের কান্না দেখে শিশুটিও স্বজনদের সঙ্গে কাঁদছিল।

নিহত শুভ চন্দ্র দাসের বাবা হরি চন্দ্র দাসকে দাফনের সময় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার জানান, তাঁর স্বামী মুসলমান ছিলেন এবং নিয়মিত নামাজ পড়তেন।

জ্যোতি আক্তার আরও উল্লেখ করেন, তাঁদের সন্তানও মুসলমান। তিনি বলেন, তাঁর শ্বশুর শুভকে হিন্দু বানিয়ে সৎকার করার চেষ্টা করেছেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর ইসলামিক রীতি অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন হওয়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর স্বামীকে নৃশংসভাবে হত্যাকারী ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লাল তাঁর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। ২০০৩ সালে তাঁর মা পার্বতী রানী দাস তাঁর তিন সন্তানকে (দুই ছেলে ও এক মেয়ে) নিয়ে হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তাঁর মায়ের নাম হয় আয়েশা বেগম। শুভ চন্দ্র দাসের নতুন নাম রাখা হয় মো. বিল্লাল এবং তাঁর ছোট ভাই সুজনের নাম হয় ইব্রাহিম। তবে, তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শুভ চন্দ্র দাস নাম পরিবর্তন করা হয়নি। পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, শুভ মুসলিম পরিচয়েই বড় হয়েছেন।

প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে শুভ মুসলিম তরুণী জ্যোতি আক্তারকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে কাবিননামার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁদের সংসারে সুমাইয়া আক্তার নামে দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। তাঁরা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

পরিবারের তথ্যমতে, মরদেহ নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে শুভর মরদেহ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অ্যাম্বুলেন্সের ফ্রিজে রাখা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশনায় মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পাঠানো হয়।

শুভ চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর বাবা হরি চন্দ্র দাস বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রও এই সময়ে উদ্ধার করা হয়।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপরাধ ও অপারেশন তারেক আল মেহেদী জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...
ধর্মীয় বিরোধে হিমঘরে মরদেহ, আট দিন পর দাফন সম্পন্ন | বাংলানিউজবিডিহাব