ডিজিটাল যুগে বিনোদন মাধ্যমের বিবর্তন ও আইনি বিধিনিষেধ
সম্পাদক১ আগস্ট, ২০২৬ · 66 দিন আগে
ডিজিটাল যুগে বিনোদন মাধ্যমের বিবর্তন ও আইনি বিধিনিষেধ
গত চার দশকে বাংলাদেশে বিনোদন দেখার মাধ্যমে এসেছে আমূল পরিবর্তন, ভিসিআর থেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আদালতে শুনানির ভিডিও শেয়ারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বাংলাদেশে গত চার দশকে বিনোদন দেখার মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ভিসিআর ও ভিডিও ক্যাসেটের যুগ পেরিয়ে দর্শক এখন স্মার্টফোন, স্মার্ট টিভি ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিনোদন দেখছেন। প্রযুক্তির এই বিবর্তন শুধু দেখার মাধ্যমই বদলায়নি; এটি দর্শকের অভ্যাস, কনটেন্টের ধরন এবং পুরো বিনোদন শিল্পের অর্থনীতিকেও বদলে দিয়েছে।
আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকে বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার বা ভিসিআর। তখন একটি ভিসিআর থাকা অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতার প্রতীক ছিল। শহরজুড়ে ভিডিও ভাড়া দেওয়ার দোকান গড়ে উঠেছিল, যেখানে নতুন সিনেমার ক্যাসেট সংগ্রহ করতে দর্শকদের ভিড় থাকত।
ভিসিআর ছিল চৌম্বকীয় টেপভিত্তিক একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে টেলিভিশন অনুষ্ঠান, নাটক বা সিনেমা রেকর্ড করে সুবিধামতো সময়ে দেখা যেত। এটি সেই সময়ের জন্য এক বৈপ্লবিক ধারণা ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেসব ব্যবসা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি কেবল টিভির বিস্তার দর্শকদের ঘরে ঘরে শতাধিক দেশি-বিদেশি চ্যানেল পৌঁছে দেয়। এরপর ডিভিডি, সিডি এবং ইউএসবি ড্রাইভের যুগ আসে।
২০১০ সালের পর স্মার্টফোন, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং সাশ্রয়ী মোবাইল ডেটার বিস্তারে বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে অনলাইন ভিডিও। দর্শক এখন নির্দিষ্ট সম্প্রচারের সময়ের অপেক্ষা করেন না; বরং নিজের সুবিধামতো সময়েই কনটেন্ট দেখতে চান। এই ‘অন-ডিমান্ড’ সংস্কৃতিই ওটিটির সবচেয়ে বড় শক্তি।
বাংলাদেশের ওটিটির উত্থান ঘটে মূলত করোনা মহামারির সময়। তখন এদেশে ওটিটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ে। ঘরে অবস্থানরত দর্শকেরা ওয়েব সিরিজ, সিনেমা ও মৌলিক কনটেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়েন। দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলোও এই সুযোগে নিজেদের বিনিয়োগ বাড়ায়।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্থানীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে চরকির ৩ কোটিরও বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটি চালুর পর থেকে দর্শক এ পর্যন্ত ১০০ কোটি ঘণ্টারও বেশি কনটেন্ট দেখেছেন।
অন্যদিকে বঙ্গের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৩ লাখের বেশি। ২০২৫ সাল নাগাদ তাদের মাসিক ভিউ ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বায়োস্কোপ, বিঞ্জ ও আই-স্ক্রিনের মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন হলেও, তারা নিয়মিত বিরতিতে তাদের দর্শক কত ঘণ্টা কনটেন্ট দেখেছে সেই বাণিজ্যিক ডেটা জনসমক্ষে প্রকাশ করে না।
মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে মোবাইল ব্যালেন্স ব্যবহার করেই ওটিটি সাবস্ক্রিপশন কেনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ডিজিটাল বিনোদনে প্রবেশ আরও সহজ হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধি, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং স্থানীয় ভাষার কনটেন্টের চাহিদা বাড়ার কারণে আগামী কয়েক বছরেও ওটিটি বাজার ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হবে।
প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব সাইফ আহমাদ বলেন, "আগে টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করত দর্শক কখন কী দেখবেন। এখন দর্শকই ঠিক করেন কখন কোথায় কী দেখবেন। এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও।"
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আবুল খায়ের বুলবুল মনে করেন, ওটিটি বাংলাদেশের নির্মাতাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, "টেলিভিশনের সময়সীমা বা প্রচলিত সেন্সর কাঠামোর বাইরে গিয়ে নির্মাতারা এখন ভিন্ন ধরনের গল্প বলার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে নতুন নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের জন্যও নতুন বাজার তৈরি হয়েছে।"
ওটিটির প্রসারের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। কপিরাইট লঙ্ঘন, পাইরেসি, বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ব্যবসার টেকসই মডেল এখনো বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় কনটেন্টে আরও বিনিয়োগ, শক্তিশালী কপিরাইট সুরক্ষা এবং নীতিগত সহায়তা ছাড়া স্থানীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্ট সুপারিশ, ব্যক্তিগতকৃত বিনোদন, ফাইভ-জি প্রযুক্তি এবং স্মার্ট টিভির ব্যবহার আরও বাড়বে। ফলে বিনোদনের অভিজ্ঞতাও হবে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
চার দশক আগে একটি ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া এনে পরিবারের সবাই মিলে সিনেমা দেখাই ছিল উৎসব। আজ একই পরিবারের সদস্যরা একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ডিভাইসে আলাদা কনটেন্ট দেখছেন। ভিসিআর থেকে ওটিটি, পরিবর্তনের এই যাত্রা কেবল প্রযুক্তির বিবর্তনের গল্প নয়; এটি মানুষের জীবনধারা, সংস্কৃতি এবং বিনোদন ভোগের অভ্যাসের এক নীরব বিপ্লব।
এদিকে, আদালতে শুনানির ভিডিও রেকর্ড ও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, পূর্বানুমতি ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় আদালতের কার্যক্রমের অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং পোস্ট বা আপলোড করা নিষিদ্ধ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আদালতের কার্যক্রমের রেকর্ডিংয়ের অনিয়ন্ত্রিত প্রচারকে "বোতল থেকে বেরিয়ে আসা দৈত্যের" সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই প্রচারের ফলে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং বিচার ব্যবস্থার উপর জনগণের আস্থা কমছে বলে একজন সাংবাদিক আবেদন করেছিলেন।
আদেশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বা সুপ্রিম কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেলের পূর্বানুমতি ছাড়া বিচারিক কার্যক্রমের অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগ্রহ, পরিবর্তন, প্রচার, পোস্ট, রি-পোস্ট, আপলোড বা মনিটাইজেশন করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, এই আদেশের ফলে আদালতের কার্যক্রমের খবর পরিবেশনের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। এটিকে কোনোভাবেই বাক-স্বাধীনতা খর্ব করার আদেশ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিচারপতি বাগচী বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, "আমরা মূলত ভিডিও রেকর্ডিং এবং সেই ভিডিও আপলোড করাটাই বন্ধ করছি।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি কোনো লাইভ-স্ট্রিমিং বা অডিও-ভিজুয়াল দেখানো হয়, তবে তা অবশ্যই হাইকোর্টের সেক্রেটারি জেনারেল এবং রেজিস্ট্রার জেনারেলের অনুমতি সাপেক্ষে হতে হবে।
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা উল্লেখ করেন যে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এমন সব ক্লিপে ভরে আছে যেখানে আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তিতর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এর জবাবে বিচারপতি বাগচী বলেন, "বোতল থেকে বেরিয়ে আসা কোনো দৈত্যকে আমরা আর আটকাতে পারি না।"
আদালত যে ২৪ ঘণ্টা বিনোদনমূলক চ্যানেল হতে পারে না, তা উল্লেখ করে বিচারপতি বাগচী বলেন, "আমাদের সীমিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাই লাইভ-স্ট্রিমিং ব্যবস্থা সীমিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে স্পষ্টভাবে আবেদন করতে হবে। এটি ২৪ ঘণ্টা বিনোদনমূলক চ্যানেল হতে পারে না।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভার্চুয়াল শুনানির জন্য দেওয়া অনলাইন অ্যাক্সেস লিঙ্কগুলো প্রায়শই নির্বিচারে শেয়ার করা হয় এবং এ ধরনের প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আদালতের ভিডিও প্রচারের বিষয়ে মেটা, এক্স এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছেও নোটিশ জারি করেছে আদালত। বিচারপতি ভি মোহনাও স্পষ্ট করেছেন যে, এটি বাক-স্বাধীনতা খর্ব করার কোনো আদেশ নয়।
মতামত (0)