এআই কিভাবে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে: গবেষকদের চার সম্ভাব্য পরিস্থিতি

এআই কিভাবে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে: গবেষকদের চার সম্ভাব্য পরিস্থিতি
এআই কিভাবে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে: গবেষকদের চার সম্ভাব্য পরিস্থিতি
এআই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মানবজাতি বিলুপ্ত হতে পারে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন। এতে অবকাঠামো হ্যাক, এআই কর্তৃত্ব, ভুলবশত ধ্বংস এবং অজানা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। গবেষকরা বারবার সতর্ক করছেন যে এই প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কিছু পূর্বাভাসে অত্যন্ত হতাশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই পুরো মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। এই সম্ভাবনার হার ১০ শতাংশেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এআই জগতের অন্য কিছু বিশেষজ্ঞ এসব পূর্বাভাসের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মানুষই মানুষের বিরুদ্ধে এআই ব্যবহার করতে পারে। এই ধরনের প্রলয়সঙ্কেতমূলক বার্তাগুলো এআই জগতের একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে আসছে, যাদের প্রায়শই ‘এআই ডুমার্স’ বলা হয়।

কিন্তু অনেকেরই বড় প্রশ্ন হলো, এই ‘ডুমার্স’রা ঠিক কিভাবে মনে করেন যে একটি এআই মানবজাতির অবসান ঘটাতে পারে। সাইবার সংবাদদাতা জো টাইডি গবেষকদের কল্পিত কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করেছেন। এই পরিস্থিতিগুলো এআই দ্বারা মানবজাতির বিলুপ্তির বিভিন্ন পথ নির্দেশ করে।

প্রথম পরিস্থিতিটি সংক্ষেপে তুলে ধরেছিলেন জ্যাকব কক্সটন, যিনি আগে ওপেন এআই এবং পরে অ্যানথ্রপিকের গবেষক ছিলেন। চলতি মাসের শুরুতে তিনি নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করেন। তিনি মানবজাতির জন্য ঝুঁকির কথা বলে সতর্ক করেন এবং যুক্তি দেন যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ‘মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে’।

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এআই-এ ‘অবিশ্বাস্য গতিতে অগ্রগতি’ হওয়ার ফলে যেসব বিষয় আগে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন ‘বাস্তবে পরিণত হচ্ছে’। একটি ‘সুনির্দিষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এআই পৃথিবীর যেসব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে, সেগুলোতে হ্যাক করতে পারে’। তার কল্পিত পরিস্থিতিতে একটি নিয়ন্ত্রণহীন এআই ব্যবস্থা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করতে পারে।

যদি কোনো এআই ব্যবস্থা এসব গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়, তাহলে তা বিদ্যুৎ সরবরাহ, তাপ নিয়ন্ত্রণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং ইন্টারনেট সংযোগের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলোতে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এর ফলে সমাজে অগণিত বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে। এমনকি কিছু বিশেষজ্ঞ এমনও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই ধরনের পরিস্থিতি পারমাণবিক বিপর্যয়ের মতো চরম পরিণতির দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

পরবর্তী পরিস্থিতিটি এসেছে ‘এআই ২০২৭’ (AI 2027) শীর্ষক একটি বিস্তারিত ও প্রভাবশালী গবেষণাপত্র থেকে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে একদল এআই গবেষক এটি প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রটি অনুমাননির্ভর হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

এর সহলেখক থমাস লারসেন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে প্রযুক্তির অগ্রগতি আরও দ্রুত হয়েছে। তিনি যে পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, সেটির বর্ণনাও দেন। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে ‘এআই নিজেকে বারবার উন্নত করছে এবং তা ক্রমে এমন এক এআইয়ে রূপ নিচ্ছে, যার হাতে বিপুল সংখ্যক রোবটের নিয়ন্ত্রণ থাকবে’।

লারসেন আরও ব্যাখ্যা করেন যে, অর্থনীতির অধিকাংশ প্রত্যক্ষ কাজ তখন এসব রোবট সম্পাদন করবে। কিন্তু সেটি মানুষের জন্য উপকারী না হয়ে বরং নিজের স্বার্থসিদ্ধি নিয়ে ব্যস্ত হবে। এরপর শেষ পর্যন্ত এটি একটি জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেবে, যা অধিকাংশ মানুষকে হত্যা করবে। তারপর এটি নিজেই রোবটনির্ভর অর্থনীতি চালিয়ে যাবে এবং মানুষের আর প্রয়োজন থাকবে না।

আরেকটি পরিস্থিতিতে মানবজাতির সমাপ্তি ঘটতে পারে ভুলবশত। তথাকথিত ‘পেপারক্লিপ ম্যাক্সিমাইজার হাইপোথিসিস’ দুই দশকেরও বেশি আগে কল্পনা করেছিলেন সুইডিশ দার্শনিক নিক বোস্ট্রম। তিনি এটিকে একটি ‘চিন্তার পরীক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে একটি কাল্পনিক এআই ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য হলো যত বেশি সম্ভব কাগজের ক্লিপ তৈরি করা।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘এটি আমাদের ঘৃণা করে না বা মানুষের ওপর ক্ষুব্ধও নয়। কিন্তু এটিই তার একমাত্র লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে ক্ষমতা বৃদ্ধি বা আরও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠার মতো কিছু সহায়ক উপলক্ষ্য তৈরি হতে পারে।’ এরপর ধারণাটি হলো, কাগজের ক্লিপ বা অন্য যেকোনো লক্ষ্য অনুসরণ করা যথেষ্ট শক্তিশালী কোনো সত্তার এমন উপ-লক্ষ্য থাকতে পারে, যা মানবজাতির ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। কারণ তাকে থামানোর জন্য মানুষ না থাকলে সে আরও বেশি কাগজের ক্লিপ তৈরি করতে পারত।

প্রথমবার এই পরিস্থিতির বর্ণনা দেওয়ার দুই দশক পর বোস্ট্রম এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই ‘কার্টুনধর্মী’ কাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে, কোনো অতিবুদ্ধিমান ব্যবস্থার মানবতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে নির্দিষ্ট শত্রুভাবাপন্ন লক্ষ্য থাকার প্রয়োজন হয় না। তিনি এখন এআই সম্পর্কে ‘দ্বিধাবিভক্ত’ বলেও জানান। এর সম্ভাব্য সুফল নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত, তবে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।

এআই নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি মতবাদ রয়েছে, যার মতে অতিবুদ্ধিমান এআই কিভাবে বা কেন মানুষকে হত্যা করতে পারে, তা অনুমান করার চেষ্টা করাই অর্থহীন। চলতি মাসের মাঝামাঝি এক সাক্ষাৎকারে এই যুক্তি তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সেইফ এআই-এর একজন প্রতিনিধি। এই মতবাদ অনুযায়ী, এআই-এর ক্ষমতা এবং এর সম্ভাব্য আচরণ এত জটিল হতে পারে যে, মানুষ সে সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে অক্ষম।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...