এআই কিভাবে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে
সম্পাদক১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · 2 ঘণ্টা আগে
এআই কিভাবে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা এবং কাজের ধরন বদলে দিতে পারে বলে আলোচনা চলছে। এআই মানুষের শ্রম, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা-নির্ভরতা দখল করলে প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শুধু মানুষের কাজের পদ্ধতিই পরিবর্তন করছে না, এটি পুরো পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকেও বদলে দিতে পারে। এআই যদি মানুষের শ্রম, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা-নির্ভরতার স্থান ক্রমশ দখল করে নেয়, তাহলে প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামো কতটা টিকে থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম চিন্তাশীল যন্ত্র একদিন সম্পত্তি, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং বৈষম্যকে ধ্বংস করতে পারে বলে ধারণা পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তায় বহু পুরোনো। দার্শনিক অ্যারিস্টটল তার ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে এমন একটি কল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, যদি সব যন্ত্র মানুষের নির্দেশ ছাড়াই নিজেদের কাজ করতে পারে, তাহলে কারিগরের সহকারী বা মনিবের দাসের প্রয়োজন থাকবে না।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি একদিন শ্রেণিহীন সমাজের সূচনা করতে পারে, এমন ধারণা কার্ল মার্ক্সের লেখাতেও পাওয়া যায়। তিনি ১৮৫৮ সালে এমন এক ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করেছিলেন, যেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন জ্ঞান ‘সামাজিক জ্ঞান’-এ পরিণত হয়ে একটি ‘সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি’ বা ‘জেনারেল ইন্টেলেক্ট’-এর রূপ নেবে। মার্ক্স মনে করতেন, এই ধরনের পরিবর্তন পুঁজিবাদের প্রচলিত ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
আজ সেই সম্ভাবনাই সিলিকন ভ্যালির একাংশকে ভাবিয়ে তুলছে। গত জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের স্ট্র্যাটেজিক ফিউচার বিভাগের প্রধান ডিন বল দাবি করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপেন সোর্স মডেল নিয়ে চীনের নীতি একসময় ‘পূর্ণাঙ্গ এআই কমিউনিজম’-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ডিন বল অভিযোগ করেছেন, চীনে এআইকে একটি জনকল্যাণমূলক সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল জনপরিকাঠামো’ হিসেবে সরবরাহ করা হতে পারে। তিনি এটিকে ‘ডিস্টোপিয়ান হেলস্কেপ’ বা ভয়াবহ ভবিষ্যৎ হিসেবে আখ্যা দেন।
তবে চীনের কিমি, কিউয়েন এবং ডিপসিকের মতো মডেলের উত্থানকে পুঁজিবাদের অবসানের সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটিকে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশলের মোকাবিলায় আরেকটি কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এআই কৌশল হলো বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে এআই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানুষকে মার্কিন সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা এবং নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল করার সুযোগ তৈরি হয়। এর বিপরীতে চীন ওপেন সোর্স এআই মডেলের ওপর জোর দিচ্ছে।
এতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের সার্ভারে এআই চালাতে পারবেন এবং চীনা কোনো এআই সরবরাহকারীর মাধ্যমে নিজেদের তথ্য ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিও কমবে। চীনের ধারণা, এআই যদি সত্যিই একটি ‘সর্বজনীন প্রযুক্তি’ বা ‘জেনারেল পারপাস টেকনোলজি’ হয়ে ওঠে, তাহলে এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তিগুলোর নেতৃত্ব দখল করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে মস্তিষ্ক-কম্পিউটার সংযোগ, জৈবপ্রযুক্তি এবং ড্রোনভিত্তিক ‘লো-অল্টিটিউড ইকোনমি’ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
এই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন এগিয়ে যাবে, তা আগামী শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এর বাইরে আরেকটি পথও থাকতে পারে বলে প্রশ্ন উঠছে। দুটি ভিন্ন ধরনের শ্রেণিবিন্যাস ও বৈষম্যনির্ভর তথ্য-পুঁজিবাদের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে এআইকে যদি মানবিক প্রয়োজন পূরণের দিকে পরিচালিত করা যায়, তাহলে কী ঘটবে তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বড় ভাষা মডেল বা এলএলএমগুলো ইতোমধ্যেই মার্ক্সের বর্ণিত ‘জেনারেল ইন্টেলেক্ট’-এর কিছু বৈশিষ্ট্য দেখাচ্ছে। মানুষের তৈরি বিপুল জ্ঞান ও তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত এসব মডেল এমন কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে, যা প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ অনেক জ্ঞানভিত্তিক কর্মীর কাজের মানকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এআই ইতোমধ্যে বিভিন্ন কাজ এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরো চাকরির দায়িত্বই বিলুপ্ত করার পথে এগোচ্ছে।
কিন্তু এর ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা এখনো অনেকেই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি। বর্তমানে এআই কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া বাজার অবস্থান তাদের শেয়ারহোল্ডার ও কর্মীদের বিপুল অর্থ এনে দিচ্ছে।
তবে চাকরি ধ্বংসের ক্ষমতার কারণে এআই আগের প্রায় সব প্রযুক্তিগত বিপ্লবের চেয়ে আলাদা। অতীতে একটি ধরনের চাকরি বিলুপ্ত হলে নতুন ধরনের কাজ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এবার ধ্বংস হওয়া চাকরিগুলো একইভাবে নতুন কাজ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
হুমকির মুখে শুধু শ্রমিকদের চাকরি নয়, পুঁজিপতিদের ভূমিকাও। কোনো মেশিন যদি জুনিয়র আইনজীবী বা ওয়েব ডিজাইনারের কাজ করতে পারে, তাহলে উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসায়ীর কাজও করতে পারবে। অর্থনীতিবিদ ফিলিপ আগিয়োঁর মতে, এআই উদ্যোক্তার দক্ষতাকে স্বয়ংক্রিয় করার পাশাপাশি উদ্ভাবন ও মুনাফার মধ্যকার সম্পর্কও ভেঙে দিতে পারে। কারণ কোনো নতুন আবিষ্কারের নকশা যদি একটি মেশিন তাৎক্ষণিকভাবে অনুকরণ করে আরও উন্নত করতে পারে, তবে উদ্ভাবনের প্রচলিত ধারণা বদলে যাবে।
মতামত (0)