এআই নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগ: এক দশকে মানব অস্তিত্বের ঝুঁকি

এআই নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগ: এক দশকে মানব অস্তিত্বের ঝুঁকি
এআই নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগ: এক দশকে মানব অস্তিত্বের ঝুঁকি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। এক দশকের মধ্যে এআই মানব অস্তিত্বকে ভয়াবহ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে অ্যানথ্রোপিকের এক গবেষক দাবি করেছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কেবল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা ছবি তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি কোড লেখা, গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ ও সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই দ্রুত অগ্রগতি প্রযুক্তি গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অ্যানথ্রোপিকের নিরাপত্তা গবেষক ইভান হাবিঙ্গার দাবি করেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানুষের অস্তিত্ব ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তার মতে, মানবজাতির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি। এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে একজন গবেষকের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন।

বর্তমানে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হলেও, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি কত দ্রুত এবং কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, সেটিই তার মূল উদ্বেগের কারণ। ইভান হাবিঙ্গার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মন্তব্য করেন অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জেকব কক্সনের একটি পোস্টের প্রতিক্রিয়ায়। কক্সন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলো এমন সিস্টেম তৈরি করছে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।

এ ধরনের অতিমানবীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি নিজে থেকে সাইবার হামলা চালাতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিংবা নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর মতো কাজ করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে ঠিক কোন পথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে হাবিঙ্গার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যালাইনমেন্ট’ বিষয়টি। সহজভাবে বললে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তার আচরণ মানুষের উদ্দেশ্য, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। হাবিঙ্গারের মতে, সুপারইন্টেলিজেন্স বা মানুষের তুলনায় অত্যন্ত শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি হলে সেটিকে কীভাবে নিরাপদ ও মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সেই সমস্যার পূর্ণ সমাধান এখনও নেই।

তার আশঙ্কা, প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি যদি নিরাপত্তা গবেষণার চেয়ে দ্রুত হয়, তাহলে পরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এমন সতর্কবার্তা অবশ্য নতুন নয়। ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক এবং মেটা-সহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষকেরাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মডেলের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টের সক্ষমতা বাড়ার কারণে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্ট শুধু নির্দেশের উত্তর দেয় না; নির্দিষ্ট অনুমতি পেলে নিজে থেকে একাধিক ধাপে কাজও করতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার হামলা বা হ্যাকিংয়ের ঘটনার কথা প্রকাশ করেছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি অপরাধীদের হাতে যায়, তাহলে সাইবার আক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই মানবজাতিকে ধ্বংস করবে কি না, এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখন কারও কাছে নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কও এখন আর শুধু প্রযুক্তিটি ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা নিয়ে নয়; বরং ঝুঁকির মাত্রা কতটা এবং সেটি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তা নিয়ে। অ্যানথ্রোপিকের নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, অত্যন্ত সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কিছু ঝুঁকি এখনও কম বলে মনে হলেও ভবিষ্যতের দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে আগের তুলনায় তাদের আত্মবিশ্বাস কমেছে। সংস্থাটি সম্ভাব্য দ্রুত অগ্রগতির কিছু প্রাথমিক লক্ষণের কথাও উল্লেখ করেছে।

তাই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতিকে ধ্বংস করবেই’ এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এখন নেই। তবে প্রযুক্তির ক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে— গবেষকদের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার মূল বার্তা সেটিই।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...