এম এন লারমার সংবিধান দর্শন সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল: আলোচনা সভায় বক্তারা

এম এন লারমার সংবিধান দর্শন সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল: আলোচনা সভায় বক্তারা
এম এন লারমার সংবিধান দর্শন সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল: আলোচনা সভায় বক্তারা
আজ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় এম এন লারমা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যা তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।

আজ মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে রাজনীতিবিদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘জাত্যভিমানী সংবিধানের খেরোখাতায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন’ শীর্ষক এই সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, এম এন লারমা তা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে বলেছিলেন।

‘বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটি–২০২৬’ এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হলেও এম এন লারমার সংবিধান দর্শন পর্যালোচনা করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, সরকারের কাছে পাহাড়িদের যে সংকট তৈরি হচ্ছে, তা বাহাত্তর সালের সংবিধানের সময়ও বিদ্যমান ছিল। সে সময় এম এন লারমার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ভিন্ন জাতির হয়েও একাই নিজেদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা তুলে এনে সংবিধানের ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন।

আমেনা মহসিন আরও বলেন, এম এন লারমা তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জায়গায় বর্তমানে বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্য দিয়ে কতটুকু অন্তর্ভুক্তি সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামে কতটুকু গণতন্ত্রচর্চা হচ্ছে, সেসব বিষয়ও তিনি তুলে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ঈশিতা দস্তিদার জানান, বাংলাদেশের মানুষের জীবন এবং অধিকার সম্পর্কিত অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের সঙ্গে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন জড়িত, যা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। তিনি বলেন, এ যুগে পরিবেশ বিপর্যয়ে জনপদগুলো যখন বিপর্যস্ত হচ্ছে, তখন লারমার পরিবেশ-প্রতিবেশ দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা বিশেষভাবে উঠে আসে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, বিএনপি এবং তারেক রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ স্পষ্ট নয়, বরং ধোঁয়াশাজনক। এর চেয়ে লারমার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শন অধিক স্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, এম এন লারমা তা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে বলেছিলেন।

আলোচনা সভায় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র যতভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করুক, আদিবাসীরা আদিবাসীই। তিনি অভিযোগ করেন, নানা ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয় অধিকারকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পরও সরকারের দখলদার চরিত্র পরিবর্তিত হয় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন বাংলাদেশের সংবিধানের আলাম, যা চাকমাদের বুননশিল্পের মতো। তিনি আরও বলেন, বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করে রাষ্ট্র বাঙালি কর্তৃত্ববাদের জাত্যভিমানী চরিত্রকেই জাহির করছে।

পাভেল পার্থ উল্লেখ করেন, এম এন লারমার সংবিধান দর্শনে জুম চাষ, কৃষি চাষ, রাজস্ব আদায়, উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃষি প্রশ্ন, পরিবেশ-প্রতিবেশ দর্শন তথা শোষিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীসমূহের অধিকারকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নারী প্রশ্নও বৈজ্ঞানিক বহুত্ববাদী রাষ্ট্রেরই ধারক–বাহক, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে তিনি জানান।

পাভেল পার্থ আরও বলেন, বাংলাদেশে আদিবাসী-বাঙালির ঐতিহাসিক সম্প্রীতি অস্বীকার করে উপজাতি-ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নানা পরিচয়ের হীন বাইনারি ন্যারেটিভের মাধ্যমে রাষ্ট্র কলোনিয়াল (ঔপনিবেশিক) শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে বদ্ধপরিকর।

লেখক, গবেষক ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা–উত্তর নব্য স্বাধীন রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তিনি বলেন, তা সত্ত্বেও প্রতিহিংসা পেরিয়ে সংবিধান দর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালন করা এম এন লারমার দ্বারাই সম্ভব ছিল।

সভায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক বলেন, স্বাধীনতা–পরবর্তী সংবিধানে চাপিয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। এটি রাষ্ট্রে বহুত্ববাদী অন্তর্ভুক্তির পথে অন্তরায়। তিনি মনে করেন, বাহাত্তর সালের সংবিধানের প্রণয়নকালে এম এন লারমার দর্শন বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রের কাছে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।

আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন ‘বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটি–২০২৬’–এর সদস্যসচিব মনিরা ত্রিপুরা।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...