‘গলফ অপারেশনের’ তথ্য ফাঁসের জেরে আলকাছ মাঝিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়াউল আহসান: সাবেক র্যাব সদস্যের জবানবন্দি
সম্পাদক১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · 2 ঘণ্টা আগে
‘গলফ অপারেশনের’ তথ্য ফাঁসের জেরে আলকাছ মাঝিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়াউল আহসান: সাবেক র্যাব সদস্যের জবানবন্দি
সাবেক র্যাব সদস্য মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গলফ অপারেশন’ বিষয়ক তথ্য প্রকাশ করায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান আলকাছ মাঝিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গতকাল বৃহস্পতিবার মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘গলফ অপারেশন’ সংক্রান্ত তথ্য ‘বলে বেড়ানোয়’ আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ বা হত্যা করতে বলেছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান উল্লেখ করেন, অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে তিনি জিয়াউলের ওই নির্দেশ পালনে রাজি হননি। তবে এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে আলকাছ মাঝির পরিবার তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে জানতে পারেন।
বিগত সরকারের সময়ে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। এই মামলায় মেজর (অব.) মো. সাব্বির রহমান ওসমানী ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। কোনো ব্যক্তিকে হত্যার পর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে বা সাগরে ফেলে দিয়ে লাশ গুম করাকে ‘গলফ অপারেশন’ বলা হতো।
সাব্বির রহমান ২০০৯ সালের অক্টোবরে র্যাব-৮ বরিশালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। তখন র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার এবং গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান। ২০১৩ সাল পর্যন্ত সাব্বির র্যাবে দায়িত্ব পালন করেন।
জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী বলেছেন, ২০১১ সালের জুন মাসে জিয়াউল আহসান তাঁকে ফোন করে আলকাছ মাঝির বিষয়ে জানতে চান। আলকাছ মাঝি ছিলেন ‘গলফ কাজে’ নিয়োগপ্রাপ্ত অন্যতম মাঝি। উত্তরে সাব্বির রহমান জানান, এই মাঝির ব্যাপারে তাঁর কিছু জানা নেই।
এতে জিয়াউল আহসান কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘আলকাছ মাঝি গলফ অপারেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে, যা র্যাবের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে।’ এরপর জিয়াউল আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ শুনে শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে সাব্বির রহমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন। একপর্যায়ে জিয়াউল বলেন, ‘থাক, লাগবে না।’
পরে সাব্বির রহমান ঘটনাটি তাঁর অধিনায়ককে জানান। সাব্বির রহমান আরও উল্লেখ করেন, জিয়াউল ‘গলফ অপারেশন’ পরিচালনার সময় যেসব মাঝি নৌকা বা ট্রলার চালাতেন, তাঁদের মধ্যে আলকাছ অন্যতম ছিলেন। জিয়াউলের সঙ্গে যে কয়েকবার তিনি অভিযানে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, অধিকাংশ সময় আলকাছকেই মাঝি হিসেবে দেখেছিলেন।
এর সপ্তাহখানেক পর হঠাৎ অধিনায়ক তাঁকে অফিসে ডেকে পাঠান। সেখানে অধিনায়কের সামনে বসা ব্যক্তিদের আলকাছের পরিবার বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সে সময় আলকাছের স্ত্রী জানান, চার-পাঁচ দিন আগে আলকাছকে ফোন করে ডেকে নিয়ে গেছেন জিয়াউল। এরপর থেকেই তাঁর কোনো সন্ধান মিলছে না।
সাব্বির রহমান জবানবন্দিতে ২০১০ সালের মে মাসের এক সন্ধ্যার ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, সেদিন খবর পান জিয়াউল আহসান বরিশাল আসছেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই জিয়াউল তাঁর সরকারি গাড়ি ও দুটি মাইক্রোবাস নিয়ে ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। আধা ঘণ্টা পর অধিনায়ক ও জিয়াউল অফিস থেকে বের হয়ে গাড়ির কাছে আসেন এবং সাব্বিরকে সঙ্গে যেতে বলেন।
সাব্বির জিয়াউলের গাড়ির পেছনে বসেন। ওই গাড়িতে জিয়াউলের সঙ্গে অধিনায়কও ছিলেন। ব্যাটালিয়ন সদর থেকে তাঁদের গাড়ির পেছনে ঢাকা থেকে আসা র্যাবের গোয়েন্দা শাখার মাইক্রোবাস দুটিও চলতে থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর তাঁরা চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত একটি মাছ ধরার ট্রলার দেখতে পান।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা মাইক্রোবাস থেকে নেমে ট্রলারে ওঠেন। র্যাব সদস্যদের সঙ্গে চারজন ব্যক্তিকে মাথায় কালো টুপি পরা ও হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় ট্রলারে উঠতে দেখেন তিনি। এই চারজনকে ট্রলারের মাছ রাখার খোলে ঢোকানো হয়। এরপর জিয়াউল, অধিনায়ক ও সাব্বিরও ট্রলারে ওঠেন।
জিয়াউল আহসান ট্রলারটিকে মোহনার দিকে নিয়ে যেতে বলেন। সেদিন আবহাওয়া প্রতিকূল ছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পর সামনে এগোনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বিষয়টি জিয়াউলকে জানানো হয়। তখন জিয়াউল তাঁকে পানির গভীরতা মাপার নির্দেশ দেন। সুকানির সহকারীকেও ট্রলারের সামনে গিয়ে পানির গভীরতা মাপতে বলেন।
তাঁরা কয়েকবার পানির গভীরতা জানানোর পর জিয়াউল গতি কমিয়ে দিতে বলেন। এরপর জিয়াউলের ইশারায় র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা খোল থেকে প্রথম ব্যক্তিকে হাত বাঁধা ও মুখ ঢাকা অবস্থায় পাটাতনে তুলে আনেন। তাঁর গলা ও পায়ে দুটি সিমেন্টভর্তি বস্তা বাঁধা হয়। এরপর র্যাবের এক সদস্য মাথায় কুশন ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে একটি গুলি করেন। পরে অন্য এক সদস্য নাভি বরাবর পেট কেটে ফেলেন এবং পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কাটার সঠিকতা নিশ্চিত করেন। জিয়াউল তখন সুকানিকে ইঞ্জিনের শব্দ বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
মতামত (0)