ইসলামী দৃষ্টিকোণে জুয়ার ভয়াবহ ক্ষতি

ইসলামী দৃষ্টিকোণে জুয়ার ভয়াবহ ক্ষতি
ইসলামী দৃষ্টিকোণে জুয়ার ভয়াবহ ক্ষতি
ইসলামে জুয়াকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ইসলামে জুয়াকে ‘মাইসির’ ও ‘কিমার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো শ্রম, ব্যবসায়িক বিনিময় বা বৈধ চুক্তি ছাড়া কেবল ভাগ্য বা ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে অন্যের সম্পদ হস্তগত করাকে ইসলাম কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। ক্যাসিনো, তাসের বাজি, আধুনিক প্রযুক্তির স্পোর্টস বেটিং এবং অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন অ্যাপস—এগুলো সবই ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র ও ঘৃণ্য কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি এবং ভাগ্যনির্ধারক তিরসমূহ—এসবই শয়তানের অপবিত্র ও ঘৃণ্য কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা চূড়ান্ত সফলতা লাভ করতে পারো।’ (সুরা মায়িদাহ, আয়াত: ৯০)। জুয়ার ভয়াবহ প্রভাব কেবল একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পুরো পরিবার ও সমাজব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জুয়ার ফলে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি হয়। জুয়া মানুষের মনে এক অসুস্থ লোভ ও আক্রোশের জন্ম দেয়। পরাজিত ব্যক্তির মনে বিজয়ীর প্রতি তীব্র হিংসা, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে চরম সামাজিক শত্রুতার সৃষ্টি করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা এই মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় তুলে ধরে বলেন, ‘শয়তান তো শুধু এটাই চায় যে মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিক এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখুক। অতএব, তোমরা কি এখনো নিবৃত্ত হবে না?’ (সুরা মায়িদাহ, আয়াত: ৯১)।

দ্বিতীয়ত, জুয়ার মাধ্যমে অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়। জুয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো অন্যকে নিঃস্ব করে নিজের পকেট ভারী করা। অর্থনৈতিক লেনদেনে কোনো বৈধ বিনিময়মূল্য, উৎপাদনশীল শ্রম বা পারস্পরিক সম্মতিপূর্ণ বৈধ ব্যবসা ছাড়া এভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করা স্পষ্ট জুলুম। আল্লাহ–তাআলা সতর্ক করে বলেন: ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের ধনসম্পদ গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কোনো ব্যবসা করা বৈধ...’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)। জুয়াড়ির উপার্জিত প্রতিটি পয়সা বাতিল ও অন্যায় আয়ের অন্তর্ভুক্ত।

তৃতীয়ত, জুয়ার কারণে দোয়া কবুল হয় না। জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ শতভাগ হারাম। রাসুল (সা.) এমন এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত টেনেছেন, যে দূর-দূরান্তে দীর্ঘ সফর করে পরিশ্রমে ধূলিমলিন ও রুক্ষ বেশে আকাশের দিকে হাত তুলে কাতর কণ্ঠে ডাকতে থাকে, ‘হে আমার প্রতিপালক, হে আমার পালনকর্তা’ অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং সে লালিত-পালিত হয়েছে সম্পূর্ণ হারাম উপার্জনে। এরপর নবীজি (সা.) প্রশ্ন রাখেন, ‘তাহলে এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)।

চতুর্থত, জুয়া অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ডেকে আনে। জুয়ার লোভ মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। সাময়িক কিছু জয়ের ফাঁদে পড়ে মানুষ আরও বড় বাজি ধরে। একপর্যায়ে নিজের জমানো মূলধন, স্থাবর সম্পত্তি এমনকি ভিটেমাটি পর্যন্ত হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা জুয়ার এই বাস্তব ক্ষতি সম্পর্কে বলেন, ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন—এ দুটোর ভেতর রয়েছে মহাপাপ; যদিও মানুষের জন্য তাতে কিছু (সাময়িক) উপকারিতা রয়েছে, কিন্তু এগুলোর পাপ ও ক্ষতির দিক উপকারিতার চেয়ে বহুগুণ বড়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৯)।

পঞ্চমত, জুয়া মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়। জুয়া হলো এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক আসক্তি। ক্রমাগত অর্থ হারানো এবং ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে জুয়াড়ি তীব্র বিষাদ, মানসিক অস্থিরতা ও হতাশায় ভোগে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তার পরিবারে। জুয়ার টাকার জন্য পরিবারে নিত্যদিন অশান্তি, মারধর ও দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ, পরিবারের অকালপতন এবং জুয়াড়ির আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। জুয়ার ঋণ শোধ করতে কিংবা পুনরায় বাজি ধরার অর্থের জোগান দিতে গিয়ে ব্যক্তি ধীরে ধীরে ভয়ংকর অপরাধের পথে পা বাড়ায়।

সপ্তমত, জুয়া পরকালে বেহেশত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়। জুয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো পরকালের চিরন্তন ক্ষতি। একজন জুয়াড়ি যদি তওবা ছাড়া এই পাপে অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। রাসুল (সা.) কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ‘চার শ্রেণির মানুষ জ’।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...