জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া ও দল বিলুপ্তির উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার বিবরণ
সম্পাদক১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · 1 ঘণ্টা আগে
জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া ও দল বিলুপ্তির উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার বিবরণ
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার একাধিক উদ্যোগ ও দল বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
একাত্তরে ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নেতারা এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক করেছিলেন। তবে নেতৃত্বের মত পরিবর্তন, দলীয় কমিটির বিরোধিতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে এই উদ্যোগগুলো থেমে যায়।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা বইয়ে ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগগুলোর এমন বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ের ‘রিফর্ম অ্যাজেন্ডা উইদইন জামায়াত’ অধ্যায়ে এসব ঘটনার বর্ণনা আছে।
বইটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০১৯ সালে জামায়াতের নির্বাহী কমিটি একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা, দল বিলুপ্ত করা এবং নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে দলটি সরে আসে। এরপরই ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আসামিপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে যান। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত তিনি আর দেশে ফেরেননি।
যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি আত্মপ্রকাশ করা এবি পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন। দেশে ফেরার পর ২০২৫ সালের ৪ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান।
আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে রুকন হন এবং ১৯৯১ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরায় অন্তর্ভুক্ত হন। ২০০৩ সালে তাকে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলটির একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছিলেন।
বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ২২ জুন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রায় এক বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই, জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামীকে চিঠি লিখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর গোলাম আযমের জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
রায়ের পর ২৪ জুন ঢাকার বায়তুল মোকাররমে একটি বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গোলাম আযমের বক্তব্য প্রস্তুতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, তার যত দূর মনে পড়ে, তিনিও ওই কমিটির সদস্য ছিলেন। গোলাম আযমকে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
রাজ্জাকের মূল্যায়ন ছিল, সুদৃঢ় অবস্থানে থেকে ক্ষমা চাইলে তা আন্তরিক বলে বিবেচিত হতো। এতে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে কঠোর ও তার ভাষায় ‘প্রায়শই অযৌক্তিক’ সমালোচনার অবসান ঘটাতে পারত। গোলাম আযম নীতিগতভাবে এই প্রস্তাবে একমতও হয়েছিলেন।
কিন্তু সমাবেশে গোলাম আযম কেবল বলেন, ‘অতীতে যদি আমি কোনো ভুল করে থাকি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।’ রাজ্জাকের মতে, গণমাধ্যম মূলত বক্তব্যটি উপেক্ষা করেছিল। তিনি একে বড়জোর দায়সারা ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে এটি ক্ষমা প্রার্থনাই ছিল না; গুরুতর একটি বিষয় মোকাবিলার অসংলগ্ন চেষ্টা ছিল।
২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোটের নির্বাচনী বিজয়কে একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলার আরেকটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই উদ্যোগ নেওয়ার জন্য দলের ভেতরে তৎপরতা শুরু করেন তিনি।
রাজ্জাক লিখেছেন, একটি বিবৃতির খসড়া তৈরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক—আফতাব আহমেদ, এম মাহবুবউল্লাহ ও আবদুর রবের সহায়তা নেন। কয়েক সপ্তাহের চেষ্টায় খসড়া তৈরি হয়। এতে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতের অবস্থানের ব্যাখ্যা এবং একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ছিল। পাশাপাশি যুদ্ধকালীন বর্বরতায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।
খসড়ার অনুমোদন নিয়ে প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী। উপস্থিত ছিলেন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এ টি এম আজহারুল ইসলাম। পরে মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি গঠিত হয়।
বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, উপকমিটি অন্তত ছয়বার বৈঠক করে। বিজয় দিবসের আগে সংবাদ সম্মেলনের প্রাথমিক সিদ্ধান্তও হয়। মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে আগ্রহী ছিলেন। তবে আজহারুল ইসলামের আপত্তি ছিল। একটি বৈঠকে মুজাহিদ তাকে মৃদু ভর্ৎসনাও করেছিলেন।
মতামত (0)