জলবায়ু প্রস্তুতি কাগজে ভালো, বাস্তবায়নে ঘাটতি: আইনুন নিশাত

জলবায়ু প্রস্তুতি কাগজে ভালো, বাস্তবায়নে ঘাটতি: আইনুন নিশাত
জলবায়ু প্রস্তুতি কাগজে ভালো, বাস্তবায়নে ঘাটতি: আইনুন নিশাত
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেছেন, বাংলাদেশের জলবায়ু প্রস্তুতি কাগজে ভালো হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। তিনি আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব এবং বিদেশি সংস্থার প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেছেন, বাংলাদেশের জলবায়ু প্রস্তুতি কাগজে ভালো হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু একটি উদীয়মান বিষয় হিসেবে না দেখে এর সম্ভাব্য প্রভাব মডেল করে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে ‘দ্য সৈয়দ হুমায়ুন কবির মেমোরিয়াল রিসার্চ সিম্পোজিয়াম-২০২৬’ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।

‘ক্লাইমেট অ্যাডাপশন, নলেজ অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল কনস্ট্রেইনস’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে আইনুন নিশাত এসব কথা বলেন। বাংলার পাঠশালা ও সাজেদা ফাউন্ডেশন দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

অধ্যাপক আইনুন নিশাত উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের কাগজে-কলমে প্রস্তুতি ভালো। তবে জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কি না, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। একটি কাজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেই কাজ তৈরির সময় কৃষি মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা মেলেনি।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকটের বিষয়ে আইনুন নিশাত বলেন, শুধু পানির ট্যাংক বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও ব্যবহারকে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তিনি মাঠের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বা উপকূলীয় এলাকার জন্য তা ভিন্ন হতে পারে।

অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও হিসাব-নিকাশ করা হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ বছর পর পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা এখনই মডেল করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, আজকের তরুণেরাই ভবিষ্যতে এর প্রভাব বেশি ভোগ করবেন।

আইনুন নিশাত আরও বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত চিন্তাভাবনাকে এখনো অনেকাংশে বিদেশি সংস্থা ও সংগঠন প্রভাবিত করে। এসব সংস্থার ধারণা হলো বাংলাদেশের সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা নেই। তারা অর্থ নিয়ে আসে এবং সেই অর্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন নথি তৈরি হয়।

তিনি বলেন, পরে সেসব নথি বাস্তবে তেমন কাজে না লেগে পড়ে থাকে, যা ‘সেলফে সুন্দর ধুলা খায়’। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাগজে পরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

এই সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক শাহীন ইসলাম এবং সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মো. সামসুদ্দোহা বক্তব্য দেন। সেশনে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স ইন ক্লাইমেট ভালনারেবল রিজিওন’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র তুলে ধরা হয়।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে অনলাইনে যুক্ত হন অস্ট্রেলিয়ান গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড এইজড কেয়ারের সিনিয়র রেগুলেটরি স্পেশালিস্ট শামারুহ মির্জা। তিনি বলেন, যেকোনো নীতি প্রণয়নে শুধু ভালো উদ্দেশ্য বা একটি সমস্যার সমাধান যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এর প্রভাব, বাস্তবায়নকারী, অর্থায়ন এবং জেলা পর্যায়ে কাজ কীভাবে হবে, এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

শামারুহ মির্জা আরও বলেন, নীতি প্রণয়নকারীদের সিদ্ধান্ত অবশ্যই যুক্তিসংগত, ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গবেষক, সমস্যার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আরও শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে শামারুহ মির্জা বলেন, গবেষণায় অনেক সময় তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন ফল দেয়। নীতির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়; তাই নিজের সমাধানকে আঁকড়ে না ধরে কী জানা আছে, কী জানা নেই এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কী, তা বিবেচনা করা জরুরি। তিনি মানুষের জরুরি প্রয়োজন ও মানবিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করে, সেটিও বুঝতে জোর দেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...