ভিডিও

কক্সবাজার থেকে সাইকেলে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে বীর কুমারের ঐতিহাসিক যাত্রা

কক্সবাজার থেকে সাইকেলে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে বীর কুমারের ঐতিহাসিক যাত্রা
কক্সবাজার থেকে সাইকেলে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে বীর কুমারের ঐতিহাসিক যাত্রা
রাঙামাটির বীর কুমার তনচংগ্যা কক্সবাজারের জিরো পয়েন্ট থেকে সাইকেলে নেপালের এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছেছেন, ৩৭ দিনে এই যাত্রা সম্পন্ন করে তিনি মানবিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।

রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার বাসিন্দা বীর কুমার তনচংগ্যা সাইকেলে কক্সবাজারের জিরো পয়েন্ট থেকে নেপালের এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছেছেন। তিনি গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছান। কক্সবাজার থেকে এই দুর্গম পথে সাইকেলে বেজ ক্যাম্পে পৌঁছাতে তার সময় লেগেছে ৩৭ দিন।

গত ১৬ আগস্ট সকালে কক্সবাজারের কবিতা চত্বর বিচ থেকে তার "সি টু হিমালয়াস এক্সপেডিশন ফর অ্যাওয়ারনেস" নামের এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে অভিযানের সূচনা হয়। এরপর তিনি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং ভারত হয়ে শিলিগুড়ি পেরিয়ে নেপালে পৌঁছে হিমালয়ের দুর্গম অভিযান শুরু করেন।

বীর কুমারের দাবি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে স্থলপথে সাইকেলে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানো প্রথম বাংলাদেশি সাইক্লিস্ট তিনি। একই সাথে তিনি প্রথম ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাইক্লিস্ট হিসেবে এই অর্জন করেছেন বলে জানান। তার এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল রক্তদান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু ন্যায্যতার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা।

অভিযানের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চেয়েছেন এবং দেশের অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের সম্ভাবনা বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর তিনি গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে ৫ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতার কালা পাথরেও পৌঁছেছেন।

অভিযানের শুরু থেকেই বীর কুমার তার প্রতিদিনের যাত্রার অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ এই পথে তাকে প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং ঝুঁকিপূর্ণ নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে, আবার কখনো উঁচু পাহাড়ি পথে সাইকেল চালিয়ে তিনি তার লক্ষ্য পূরণ করেছেন।

এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগে তিনি হিমালয়ের দুটি দুর্গম চূড়া ও একটি গিরিপথ অতিক্রম করেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি ৫ হাজার ৮৩ মিটার উচ্চতার নাংকার্তশাং পিক চূড়ায় ওঠেন। সেদিন বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে তিনি চূড়ায় পৌঁছান।

পরদিন, ১৯ সেপ্টেম্বর বীর কুমার ৫ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতার ছুকুং রি পিকের চূড়ায় ওঠেন। বিকেল ৪টা ৫১ মিনিটে তিনি সেখানে পৌঁছান। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর তিনি ৫ হাজার ৫৩৫ মিটার উচ্চতার কংমা লা পাস অতিক্রম করেন এবং সেদিন দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে সেখানে পৌঁছান। এর পরদিনই তার গন্তব্য ছিল এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প।

এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর বীর কুমার জানান, এই অর্জন তার একার নয়। দীর্ঘ অভিযাত্রায় যারা সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি তার লক্ষ্যগুলো পূরণ করে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে নিরাপদে দেশে ফিরতে চান বলে উল্লেখ করেন।

তার এই সাইকেল অভিযানে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে তিনি সাইকেলে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেছেন এবং টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ক্রস-কান্ট্রি রুটও পাড়ি দিয়েছেন। এছাড়া তিনি ভারতের ১০টি রাজ্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু করে প্রায় ৭১ দিনে ৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ২০২৪ সালের মার্চে তিনি দেশে ফেরেন। বীর কুমার ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক অর্জন করেছেন। তিনি কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংক ও ওয়াগ্গা ভলান্টিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছায় রক্তদান, মানবসেবা এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি যুক্ত আছেন।

কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হানুল ইসলাম জানান, কাপ্তাই উপজেলার বীর কুমার তনচংগ্যা সাইকেল চালিয়ে এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পে পৌঁছেছেন। তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাইকেল চালিয়ে এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানো প্রথম ব্যক্তি।

বীর কুমার বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্র থেকে নেপালের পাহাড় পর্যন্ত এই যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতির রূপকে কাছ থেকে দেখা এবং বিশ্ববাসীকে পরিবেশ সংরক্ষণের আকুল বার্তা দেওয়া। প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করা, নিজের বর্জ্য নিজে অপসারণ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই তার কাজ।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...