ক্লিনিকে চাকরি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পিএইচডি: কক্সবাজারের নীলা রাখাইনের অদম্য শিক্ষাযাত্রা
সম্পাদক৩০ জুলাই, ২০২৬ · 69 দিন আগে
ক্লিনিকে চাকরি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পিএইচডি: কক্সবাজারের নীলা রাখাইনের অদম্য শিক্ষাযাত্রা
কক্সবাজারের নীলা রাখাইন পিএইচডি করবেন যুক্তরাষ্ট্রে | প্রথম আলো
ক্লিনিকে চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, কক্সবাজারের সেই নীলা রাখাইন পিএইচডি করবেন যুক্তরাষ্ট্রে
কক্সবাজারের নীলা ওয়ান রাখাইন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন। পূর্ণ বৃত্তিতে ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নিয়েছেন
কক্সবাজারের মেয়ে নীলা ওয়ান রাখাইন, যিনি একসময় ক্লিনিকে চাকরি করে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ যুগিয়েছিলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন। তার এই অদম্য যাত্রার চূড়ান্ত ধাপে তিনি পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে তার গবেষণার মূল বিষয় হবে শিক্ষা, বিশেষত টিচিং অ্যান্ড লার্নিং। আগামী ১ আগস্ট তিনি স্বপ্ন পূরণের পথে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন, যেখানে পাঁচ বছরের এই শিক্ষাযাত্রা শেষে তিনি অর্জিত জ্ঞান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজে লাগানোর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী তার লক্ষ্য পূরণে শুরু থেকেই ছিলেন অবিচল। তার জীবনের এই অসাধারণ বাঁক শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বপ্ন জয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাবা মংফ্রুথেন রাখাইন পেশায় একজন দরজি ছিলেন, এবং চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে আর্থিক সংকট ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী।
এই আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নীলা ওয়ানের পক্ষে কোনো ভর্তি কোচিংয়ে অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির সময় তিনি একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে কাজ করতেন, যেখানে মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করে তার একাংশ সংসারে দিতেন এবং বাকিটা জমাতেন ভর্তি পরীক্ষার খরচ হিসেবে। সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নীলা ওয়ান জানান, আত্মীয়দের কাছ থেকে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হতো, যেখানে বলা হয়েছিল মেয়েদের এত পড়াশোনা করে কী হবে, শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করবে।
তবে এই ধরনের কথাগুলো তাকে কষ্ট দিলেও, তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন যে কাজের মাধ্যমেই সব জবাব দিতে হবে, আর এই বিশ্বাসই তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল, যা তাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে ভর্তি হতে উৎসাহিত করে। ৩.৪৫ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা বিষয়ে ৩.৫২ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়ানোর প্রতি তার সহজাত ভালোবাসা তাকে টিউশন করানো, স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পাঠদান, শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি এবং এমনকি মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পড়ানোর মতো কাজে আগ্রহী করে তোলে। এসব বহুমুখী অভিজ্ঞতা তাকে শিক্ষা বিষয়ে গভীর গবেষণার প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলেছিল। পিএইচডির জন্য তার প্রস্তুতি হঠাৎ করে শুরু হয়নি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজেকে গবেষণার উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, অঙ্গন ও রঁদেভু শিল্পী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই সংগঠনগুলোতে কাজের মাধ্যমে তিনি নেতৃত্ব, যোগাযোগ এবং দলগত কাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন, যা তার ভবিষ্যতের পথ সুগম করেছে। স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি নি জ রাখাইনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি তার পুরো যাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে পাশে ছিলেন।
নীলা ওয়ান জানান, বিয়ের পর যৌথ পরিবারে থেকেও পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না, তবে স্বামী ও বাবার অনুপ্রেরণায় তিনি কখনো নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। তার এই দৃঢ় সংকল্প এবং পরিবারের সমর্থন তাকে প্রতিকূলতা মোকাবিলায় আরও শক্তি জুগিয়েছে। তিনি আরও একবার তার শৈশবের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, "ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। এক আত্মীয় আমার মাকে বলেছিলেন, 'মেয়েকে এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করবে।' কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবে আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, মানুষ যা–ই বলুক, কাজ দিয়েই তার জবাব দিতে হবে। এই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।"
স্নাতকোত্তরের শেষ সেমিস্টারে থাকতেই নীলা ওয়ান ইউনিসেফের একটি প্রকল্পে শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে ইউনিসেফ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তিনি শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া, অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ১০ মিনিট স্কুলে তিনি ইংরেজি প্রশিক্ষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি ‘চালুং একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ছোটবেলা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখেছিলেন নীলা ওয়ান, যার শুরু হয়েছিল ইংরেজি ভাষার প্রতি তার গভীর আগ্রহ থেকে। এই স্বপ্ন পূরণের পুরো প্রক্রিয়ায় তার স্বামী নি জ রাখাইন ছিলেন সবচেয়ে বড় দিকনির্দেশক, যিনি আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তাকে উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন। তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও স্বামীর সমর্থনের ফলস্বরূপ, তিনি ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং এবং ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে কারিকুলাম অ্যান্ড ইন্সট্রাকশন বিষয়ে পূর্ণ বৃত্তিসহ পিএইচডির সুযোগ পান। এছাড়া, কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও কারিকুলাম অ্যান্ড ইন্সট্রাকশন বিষয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছিলেন, যদিও সেখানে পূর্ণ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে তাকে টিউশন ফি মওকুফের আবেদন করতে বলা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু হলেও, নীলা ওয়ান তার শিকড়কে ভুলতে চান না। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান একদিন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার এই যাত্রা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি অদম্য ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম এবং স্বপ্ন পূরণের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত যা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।
মতামত (0)