কুমিল্লায় ১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ডিসির সিদ্ধান্ত, প্রাণ গেল নারীর

কুমিল্লায় ১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ডিসির সিদ্ধান্ত, প্রাণ গেল নারীর
কুমিল্লায় ১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ডিসির সিদ্ধান্ত, প্রাণ গেল নারীর
কুমিল্লার মেঘনা ও তিতাস উপজেলার সীমানা বিরোধ নিরসনে ২০০৮ সালের ডিসি সিদ্ধান্ত ১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। এর জেরে গত ২৬ জুলাই এক নারী নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।

কুমিল্লার মেঘনা ও তিতাস উপজেলার সীমানা বিরোধ নিরসনে ২০০৮ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নেওয়া সিদ্ধান্ত দীর্ঘ ১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুই উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এসব সংঘর্ষের জেরে গত ২৬ জুলাই এক নারী নিহত হয়েছেন।

২০০৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় মেঘনা উপজেলার ১৪৬ নম্বর ব্রাহ্মণচর এবং তিতাস উপজেলার ২০৭ নম্বর মোহনপুর ও ১৫০ নম্বর দক্ষিণ সাতানি মৌজার সীমানা জটিলতা নিরসনে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সিএস ম্যাপের ভিত্তিতে পুনঃজরিপ, প্রয়োজন অনুযায়ী বিএস জরিপ বাতিল বা সংশোধন এবং সীমানা পিলার স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এসএ শাখার স্মারক ও সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে এই তথ্য জানা গেছে। জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, কুমিল্লা জোনের একটি চিঠিতেও জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মৌজাগুলোর সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিতাস উপজেলা ভূমি অফিস থেকেও জানানো হয় যে, চরকাঠালিয়া প্রকাশ্য চরবাটেরা গ্রামের বাসিন্দাদের বন্দোবস্তকৃত ভূমি মেঘনা উপজেলায় পড়ায় দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা ও তিতাস উপজেলার মানুষের মধ্যে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই এই বিরোধ বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। এই বিরোধের জেরেই দুই উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত ১৬ জুন দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৬ জুলাই মেঘনা উপজেলার চর বিনোদপুর এলাকায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষে ৩৮ বছর বয়সী কুহিনূর আক্তার নামে এক নারী নিহত হন। তিনি চর বিনোদপুর গ্রামের কাবিল মিয়ার স্ত্রী এবং চার সন্তানের জননী ছিলেন।

ওই ঘটনায় আরও অন্তত ৩০ জন আহত হন। তিতাস উপজেলার চরকাঠালিয়া, প্রকাশ্য চরবাটেরা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজনের সঙ্গে এই হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, ২০০৮ সালে জেলা প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ ও পিলার স্থাপন করা হলে হয়তো বিরোধটি এতটা ভয়াবহ রূপ নিত না। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৮ বছরের এই দীর্ঘসূত্রতার দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও তারা করছেন।

সাবেক ইউপি সদস্য জালাল উদ্দীন ও এলাকার আলী আকবর স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তারা বলেন, জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ নতুন বিষয় নয়, এটি প্রশাসনের নথিতে বহু বছর ধরেই ছিল। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সভা করে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও সেটেলমেন্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও বাস্তবে স্থায়ী সমাধান হয়নি।

তারা আরও বলেন, প্রশাসন সময়মতো সীমানা নির্ধারণ করে পিলার স্থাপন করলে দুই উপজেলার মানুষের মধ্যে বিরোধের সুযোগ কমত এবং সংঘর্ষের মতো ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘ ১৮ বছর সময় লেগে যাওয়া এবং এর মধ্যে একজন নারী নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নিহত কুহিনূরের স্বামী কাবিল মিয়া ফোনে বলেন, “আমি গরিব মানুষ। আমার মনে হয়, আমি বিচার পাইতাম না।” তিনি জানান, মামলা করার দিন চারজন এবং পরদিন আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তিনি শুনেছেন, ৪১ জন আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে গেছেন।

কাবিল মিয়া আরও বলেন, “আসামিদের টাকা-পয়সা আছে, তাই তারা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। আপনারা আমার জন্য একটু দয়া করেন স্যার।” এ কথা বলার পর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

কুহিনূর আক্তার হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাঈদ সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, মামলার এজাহারভুক্ত ৬১ আসামির মধ্যে আটজন এখনো গ্রেপ্তার হননি। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৫ আগস্ট ৪১ জন আসামি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, পাঁচজন কারাগারে এবং আরও সাতজন জামিনে মুক্ত রয়েছেন। এসআই সাঈদ সানাউল্লাহ উল্লেখ করেন, “সেদিন আমি হাইকোর্টে যাওয়ার আগেই আসামিরা সেখানে চলে যান। এ কারণে তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরে জানতে পেরেছি, হাইকোর্ট তাঁদের ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছেন।” মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামিদের বাড়ি বিভিন্ন এলাকায়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...