রাজধানীর লালবাগে নিখোঁজ শেখ ওয়াসিম রনির (৪৩) মরদেহ মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিন লাখ টাকা সুদের বিরোধে তাকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।
রাজধানীর লালবাগে নিখোঁজ এক ব্যবসায়ীর মরদেহ মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেছে পুলিশ। শেখ ওয়াসিম রনি (৪৩) নামের ওই ব্যবসায়ীর মরদেহ গত শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ৯ নম্বর বিসি দাস স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার পাশের মাটি থেকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ ওই ভবনটিতে অভিযান শুরু করে।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, তিন লাখ টাকা সুদে নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ওয়াসিম রনিকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবি পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নিহতের শ্যালক মুরাদ হোসেন জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর ওয়াসিম রনির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। ওই দিন ওয়াসিমের তিন লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে একটি চেক পাওয়ার কথা ছিল বলে তারা জানতে পারেন। ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকেই ওয়াসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পরিবারের সদস্যরা ওয়াসিমের কোনো সন্ধান না পেয়ে তাকে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজতে শুরু করেন। তারা ওয়াসিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তারা অভিযুক্ত মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় মাসুমের স্ত্রী ওয়াসিমের বিষয়ে কোনো খোঁজ জানেন না বলে জানান এবং শুধু বলেন, ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন, পরে চলে গেছেন।
একপর্যায়ে ওয়াসিমের কোনো সন্ধান না পেয়ে তার পরিবারের সদস্যরা লালবাগ থানায় গিয়ে নিখোঁজের বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। এরপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্নভাবে ওয়াসিমের সন্ধান চালায় পুলিশ।
মুরাদ হোসেন জানান, একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, ওয়াসিমকে হত্যা করে একটি ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। পরে ওই স্থানে অভিযান চালিয়ে মাটি খুঁড়ে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি আরও জানান, তার দুলাভাইয়ের মরদেহ লুকিয়ে রাখতে আট বস্তা মাটি এনে বাসার পাশে তাকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল।
মুরাদ হোসেন এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তিন লাখ টাকা নেওয়ার পর প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও সেই টাকা পরিশোধ করা হয়নি, এবং পরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার বোন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
আটক মাসুমের দুলাভাই জানান, তার শ্যালক মাসুম ইমিটেশন জুয়েলারির ব্যবসা করতেন। যে ভবনের পাশ থেকে ওয়াসিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ভবনের নিচতলায় মাসুমের পাইকারি কারখানা ছিল। তিনি আরও জানান, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিম রনির কাছ থেকে মাসুম তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে সুদ দেওয়ার কথা ছিল। পরে তিন লাখ টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে রনির সঙ্গে মাসুমের বিরোধ চলছিল।
মাসুমের দুলাভাই জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে ওয়াসিম পাওনা টাকা চাইতে মাসুমের ব্যবসায়িক কক্ষে যান। সেখানে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলে মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুষি মারেন। পরে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যান। তিনি পুলিশের কাছ থেকে জানতে পারেন, ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়ার পর তাকে ভবনের পাশের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। গত শুক্রবার ভোরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ওয়াসিমের মরদেহ উদ্ধার করে।
লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর ওয়াসিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্বজনরা থানায় অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় মাসুম চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ আছে কি না, হত্যার প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত (0)