মেসির বিদায়ী ম্যাচে নীল-সাদা জার্সিতে শেষ অধ্যায়
সম্পাদক৭ অক্টোবর, ২০২৬ · 3 ঘণ্টা আগে
মেসির বিদায়ী ম্যাচে নীল-সাদা জার্সিতে শেষ অধ্যায়
আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটেছে বেনিনের বিপক্ষে এক আবেগঘন ম্যাচে। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে তার অশ্রুসিক্ত বিদায় দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
বুয়েনস আইরেসের রাতটি সেদিন আর সাধারণ ছিল না। আলো, মানুষ এবং গর্জনের মাঝেও সেখানে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা লুকিয়ে ছিল। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের ৮৫ হাজারেরও বেশি দর্শক সেদিন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে আসেননি। তারা এসেছিলেন ইতিহাসের এক শেষ দৃশ্যের সাক্ষী হতে।
বেনিনের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। নীল-সাদা জার্সিতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কোটি কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষটি জাতীয় দলের হয়ে শেষবারের মতো মাঠ ছেড়েছিলেন। ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে জয়লাভ করে, তবে সেই ফলাফলের চেয়ে মেসির অশ্রুসিক্ত বিদায়ই মুখ্য হয়ে ওঠে।
২০০৫ সালে এক এলোমেলো চুলের লাজুক কিশোর হিসেবে মেসির আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয়। ২১ বছরের এই দীর্ঘ সময়ে মেসি শুধু ম্যাচ খেলেননি, তিনি একটি জাতির ফুটবল অনুভূতির সঙ্গে নিজের নামকে গভীরভাবে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের বিদায় ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির আবেগের প্রতিচ্ছবি।
পরিসংখ্যানের খাতায় তার নাম লেখা থাকবে ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল এবং ৬৮ অ্যাসিস্ট হিসেবে। তবে এই সংখ্যাগুলো কখনোই আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে মেসিকে ঘিরে থাকা আবেগের গভীরতা বোঝাতে পারবে না।
মেসির এই গল্পের শুরুটা মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। বরং একটা সময় আর্জেন্টিনার জার্সিই তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার এবং পরপর দুটি কোপা আমেরিকায় ব্যর্থতার পর তাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছিল।
২০১৬ সালে সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মহাকাব্য তখনো শেষ হয়নি।
২০২১ সালে মারাকানা স্টেডিয়ামে গল্পটি বদলে যায়। কোপা আমেরিকার ট্রফি হাতে নিয়ে মেসি যেন বহু বছরের অপেক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
এরপর ফিনালিসিমা, কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা— একের পর এক শিরোপা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করে। যে মানুষটিকে একসময় ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছিল, তিনিই ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে আপন মানুষ হয়ে ওঠেন। কাতারের মরুভূমিতে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মেসির সেই রাজকীয় পদচারণা বহু বছরের আক্ষেপের চূড়ান্ত উত্তর হয়ে আসে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও মেসি দলের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন। স্পেনের কাছে ফাইনালে হেরে শিরোপা ছুঁতে না পারলেও, ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে তিনি দেখিয়েছিলেন, বয়স তার পায়ের জাদুকে পুরোপুরি থামাতে পারেনি।
তবু সব গল্পেরই তো শেষ থাকে। ৩১ আগস্ট অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই তার শেষ রাতটির জন্য অপেক্ষা ছিল। অবশেষে সেই রাত এসেছিল নিজের শহরে, নিজের মানুষের সামনে।
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি সাদা-আকাশী সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। সতীর্থ রদ্রিগো দে পল, লো সেলসো, ক্রিস্তিয়ান রোমেরোসহ দলের সবাই অধিনায়কের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মুহূর্তটি তাদের জন্যও ছিল আবেগের।
এরপর ম্যাচের শেষ বাঁশি বেজে ওঠে। একটি শব্দের সঙ্গে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক যাত্রা শেষ হয়। ম্যাচের ফলাফল হয়তো সময়ের সাথে পরিসংখ্যানের পাতায় হারিয়ে যাবে।
তবে মেসির শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে দাঁড়ানোর দৃশ্যটি হারাবে না। শেষবার বল পায়ে নেওয়া, শেষবার সতীর্থদের সঙ্গে ছুটে যাওয়া, শেষবার মনুমেন্তালের গর্জনের মধ্যে মাঠ ছাড়ার মুহূর্ত— সবকিছুই স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।
বেনিন দলও ইতিহাসে নিজের একটি বিশেষ জায়গা করে নেয়। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এর আগে কখনো খেলেনি দলটি। ফলে আফ্রিকার এই দলটির নাম মেসির বিদায়ী ম্যাচের সঙ্গে চিরতরে জড়িয়ে যায়।
মেসি বিদায় নিয়েছিলেন, কিন্তু তার গল্প শেষ হয়নি। কিছু খেলোয়াড় মাঠ ছাড়েন, আর কিছু খেলোয়াড় মাঠ ছাড়ার পরও থেকে যান— রেকর্ডে, ছবিতে, স্মৃতিতে এবং কোটি মানুষের ভালোবাসায়। মেসি ছিলেন সেই দ্বিতীয় দলের। নীল-সাদা জার্সিতে তার শেষ রাত পেরিয়ে গিয়েছিল। মনুমেন্তালের আলোও একসময় নিভে গিয়েছিল, দর্শকের গর্জন থেমে গিয়েছিল, মাঠ খালি হয়েছিল। শুধু আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিটি যেন তখনও বলে যাচ্ছিল— একজন মেসি চলে গেছেন, কিন্তু মেসির গল্প কখনো শেষ হওয়ার নয়।
মতামত (0)