মুডি’স বাংলাদেশের ঋণমান পূর্বাভাস নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীলে উন্নীত করেছে

মুডি’স বাংলাদেশের ঋণমান পূর্বাভাস নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীলে উন্নীত করেছে
মুডি’স বাংলাদেশের ঋণমান পূর্বাভাস নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীলে উন্নীত করেছে
আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডি’স বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে বাড়িয়ে ‘স্থিতিশীল’ করেছে, যা রাজনৈতিক ও বাহ্যিক চাপ কমা এবং রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডি’স বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে বাড়িয়ে ‘স্থিতিশীল’ করেছে। রাজনৈতিক ও বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস পাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গতি ফেরা এবং রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতায় ঋণমানের এই ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক এই ঋণমান যাচাইকারী সংস্থাটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ‘ইস্যুয়ার’ এবং ‘সিনিয়র আনসিকিউরড’ রেটিংকে বি২ এবং স্বল্পমেয়াদী ইস্যুয়ার রেটিং নট প্রাইম-এ অপরিবর্তিত রেখেছে। মুডি’স জানিয়েছে, যেসব ঝুঁকির কারণে আগে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক বা ঋণাত্মক করা হয়েছিল, বি২ রেটিং পর্যায়ে তা এখন অনেকটাই সুষম বা ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক উত্তরণ এবং নতুন সরকারের পক্ষে শক্তিশালী গণরায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রার বর্ধিত রিজার্ভ, নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং রেকর্ড রেমিট্যান্সের সহায়তায় দেশের বাহ্যিক অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। এটি বাড়তি জ্বালানি আমদানি ব্যয় সামাল দিতে সাহায্য করেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা বাহ্যিক বা বিদেশি অর্থায়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। আইএমএফের পরবর্তী ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলী নিয়ে এখনও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে ঋণদাতাটির। ২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২১.৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২.৯ বিলিয়ন ডলারে। এটি দিয়ে চার মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

এই পরিস্থিতির উন্নতির পেছনে বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাহ, নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং বাজারে পূর্বে বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে মুডি’স। সংস্থাটি আশা করছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪.৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

পরবর্তীতে বিনিয়োগ ও শিল্প কারখানার কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে প্রায় ৪.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসার আগে ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সার্বিক পূর্বাভাসে উন্নতি হলেও সংকুচিত রাজস্ব ভিত্তি, ঋণ পরিশোধের দুর্বল সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের চরম ভঙ্গুরতার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের মূল ঋণমান ‘বি২’-তেই বহাল রেখেছে মুডি’স।

সংস্থাটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংস্কারের ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩২.৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে— জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ মূলধন পুনর্গঠন (রিক্যাপিটালাইজেশন) বাবদ জোগান দেওয়ার প্রয়োজন হবে। মুডি’স-এর মতে, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে – মূলধন পুনর্গঠনের এই বিশাল চাহিদা সরকারের বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে এ সময়ে ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বার্ষিক আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা তারল্য সংকট নয়, বরং সচ্ছলতা ও মূলধনের অভাব।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...