বিনোদননভোথিয়েটারে উদ্ভাবনী মেলা: প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার মিলন
নভোথিয়েটারে উদ্ভাবনী মেলা: প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার মিলন
রাজধানীর নভোথিয়েটারে চলছে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬’, যেখানে প্রযুক্তি, গবেষণা ও সৃজনশীল পণ্যের প্রদর্শনী হচ্ছে।
রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে চলছে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬’। ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই মেলার আয়োজন করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্ভাবক ও গবেষকেরা এতে অংশ নিচ্ছেন।
মেলায় প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও ধারণা তুলে ধরা হচ্ছে। দর্শনার্থীরা আগ্রহ নিয়ে স্টলগুলো ঘুরছেন এবং নতুন কী তৈরি হয়েছে, কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং সেটি মানুষের কাজে কীভাবে লাগতে পারে—এসব সম্পর্কে জানছেন। কোথাও রোবটের প্রদর্শনী চলছে, আবার কোথাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে। তরুণ উদ্ভাবকেরা পরিবেশবান্ধব নতুন ধারণা নিয়েও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তৈরি নানা প্রকল্প দর্শনার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ‘সুপার রুফ ফর ঢাকা’ নামের একটি উদ্যোগে ঢাকার ভবনের ছাদকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা দেখানো হয়েছে। এখানে একসঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ছাদ-কৃষির মাধ্যমে শহরকে আরও সবুজ করার ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে।
আরেকটি উদ্যোগে সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব ভ্রাম্যমাণ পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প প্রদর্শন করা হচ্ছে। এই ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ এলাকা বা দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে পানি বিশুদ্ধ করার কাজে কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, সেটিও মেলায় তুলে ধরা হচ্ছে। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে গবেষণার উদ্দেশ্যে ল্যাবে সংরক্ষিত বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ ও সাপের নমুনা প্রদর্শন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানান, প্রদর্শিত সাপ ও মাছের প্রজাতিগুলো বাংলাদেশে নতুন।
পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও মেলায় বেশ চোখে পড়ছে। ‘শূন্য’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান আখের ছোবড়া থেকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি প্লেট ও গ্লাস প্রদর্শন করছে। ফেলে দেওয়া আখের অংশ ব্যবহার করে একবার ব্যবহারযোগ্য এসব পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। ওটস দিয়ে তৈরি খেয়ে ফেলা যায় এমন কাপও এখানে দেখা যাচ্ছে।
তবে মেলার গল্প শুধু বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির একটি স্টলে শিক্ষার্থীদের নকশা করা ফ্যাশন ও পোশাকশিল্পের কিছু সৃজনশীল কাজ দেখা যাচ্ছে। ফলে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে যেতে যেতে কখনো প্রযুক্তি, কখনো গবেষণা, আবার কখনো নকশা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে দর্শনার্থীদের পরিচয় হচ্ছে।
নভোথিয়েটারের নিচতলার আয়োজনের বাইরে গিয়ে আরও একটু ঘুরলে মেলার আরেকটি দিক পাওয়া যায়। সেখানে শিল্পী ও উদ্যোক্তারা তাঁদের শিল্প ও নানা ধরনের সৃজনশীল পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন। এই অংশটি মনে করিয়ে দেয় যে উদ্ভাবন বলতে শুধু বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারকেই বোঝায় না, দেশীয় কারুশিল্প ও সৃজনশীল কাজও নতুন ভাবনার অংশ হতে পারে।
এখানে ছোট পরিসরে বসেছে ‘স্টুডিও টোকাই’ নামের একটি সৃজনশীল ও নান্দনিক প্ল্যাটফর্ম। একদিকে গান ও বাস্কিং চলছে, অন্যদিকে দুই পাশে বিভিন্ন শিল্পী ও উদ্যোক্তার কাজ সাজানো রয়েছে। কোথাও বই ও নানা ধরনের পোস্টার দেখা যাচ্ছে, আবার পছন্দের বই অর্ডার করে আনার সুযোগও আছে।
পাশেই ‘কিচিরমিচির’ নামের একটি উদ্যোগ নারিকেলের শক্ত অংশ, শুকনো ফল বা বীজ, বাদামের খোসার মতো প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে লোকজ বাদ্যযন্ত্র তৈরি করছে। হাতে তৈরি কাঠের নানা নকশা ও রঙের আয়না, প্যাচওয়ার্কের প্যান্ট, ফতুয়া এবং কাপড়ের তৈরি আরামদায়ক ও ফ্যাশনেবল টুপিও এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। এর পাশেই টি-শার্ট ও ফতুয়ার বাজেটবান্ধব সংগ্রহ নিয়ে আরেকটি উদ্যোগ বসেছে। কোথাও গ্রাফিতি ও ক্যারিকেচারের আঁকিবুঁকি চলছে এবং ‘হ্যালো পপ স্টুডিও’-এর উদ্যোগে ব্যাগ, বটম ও ফতুয়া দেখানো হচ্ছে।
মেলার পরিবেশ বেশ প্রাণবন্ত। দর্শনার্থীরা স্টলে স্টলে ঘুরছেন, নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের গল্প জানতে চাইছেন। তরুণ উদ্ভাবকেরাও নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, কোথায় ব্যবহার করা যায় এবং ভবিষ্যতে কীভাবে আরও উন্নত করা সম্ভব—এসব বিষয় বুঝিয়ে বলছেন। বিশেষ করে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রদর্শনী ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশ চোখে পড়ার মতো।
মতামত (0)