আন্তর্জাতিক

নেপাল-তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৭৫০, নিখোঁজ ৩ হাজার

নেপাল-তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৭৫০, নিখোঁজ ৩ হাজার
নেপাল-তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৭৫০, নিখোঁজ ৩ হাজার
নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৩ হাজার ৪৪ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখনো ৩ হাজার ৪৪ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আজ রবিবার সকালে প্রকাশিত জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালে ৭৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে এই হতাহতের খবর নিশ্চিত করেছে।

বন্যাকবলিত কয়েকটি জেলা থেকে মোট ৭৩৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে চিতওয়ানে ২৫৯টি, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ১৮৪টি, নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ৮২টি, গোরখায় ৫৮টি, নুয়াকোটে ৫২টি, ধাদিংয়ে ৫০টি, তানাহুনে ৩৬টি এবং রাসুয়ায় ১৩টি মরদেহ পাওয়া গেছে। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মানুষ ও ধ্বংসাবশেষ বহুদূর ভাটির দিকে চলে যাওয়ায় অনেক মরদেহ কয়েক শত কিলোমিটার দূর থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে।

নিখোঁজদের মধ্যে রাসুয়া জেলায় ৫৬২ জন, নুয়াকোটে ১১৫ জন এবং মাকওয়ানপুরে ৬৫ জন রয়েছেন। নিখোঁজদের তালিকায় ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী, ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক এবং তাদের সঙ্গে ভ্রমণরত ১২৭ জন নেপালিও রয়েছেন। এছাড়া, ৪৫ জন নেপালি সেনাবাহিনীর সদস্য, ২৭ জন নেপাল পুলিশের সদস্য এবং ১৩ জন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যসহ মোট ৮৫ জন নিরাপত্তাকর্মীও নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপাল সরকার জানিয়েছে, বন্যায় ২৪২ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন বা চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। নুয়াকোটে, যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম, খারাপ আবহাওয়ার কারণে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকার পর শনিবার দুপুরের আগে আবারও হেলিকপ্টার চলাচল শুরু হয়।

উদ্ধার অভিযান আজ রবিবার পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এসব কাজে মোট ১৯ হাজার ৮৯৫ জন নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, যাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৮ হাজার ৩৯৯ জন, পুলিশের ৭ হাজার ২১৩ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৪ হাজার ২০৩ জন সদস্য রয়েছেন।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী ৮ হাজার ১৮৬ জনকে উদ্ধার করেছে। উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দুই দিনে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে আটকে পড়া ২৭৯ জনকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও ২২৭ জন বিদেশি নাগরিককে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছে।

নেপালি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলো দুর্যোগকবলিত এলাকায় ঘণ্টায় মোট ১৫টি যাতায়াত করতে পারে। দিনে এভাবে প্রায় ৫০০টি ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব। প্রতিটি ফ্লাইটে কয়েকজন করে মানুষকে উদ্ধার করে আনা হচ্ছে, যাদের মধ্যে কাউকে কাউকে স্ট্রেচারে করে আনা হয়েছে।

মৃতের সংখ্যা এত বেশি হওয়ায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করাও কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি এমন মরদেহ সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্ত করার জন্য বিভিন্ন জেলার ২১টি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলোতে এখনো অনেক শ্রমিক জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাসুয়া জেলার একটি কাদায় ভরা সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ আটকে থাকতে পারেন। সুড়ঙ্গের ভেতরে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।

শনিবার উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশের পথ তৈরিতে কাজ করেন। কোথাও কাদা সরিয়ে পথ তৈরি করা হয়েছে, আবার কোথাও মাটি খনন করে ভেতরে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। একটি সুড়ঙ্গে বাতাস প্রবেশ করানো এবং ক্যামেরা পাঠানোর কাজও শুরু হয়েছে, যাতে ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

শ্রমিকদের উদ্ধারে নেপালকে সহায়তা করছে প্রতিবেশী ভারত ও চীন। ভারত একটি বিশেষায়িত সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। চীনও তিব্বত থেকে সুড়ঙ্গ উদ্ধারে বিশেষজ্ঞদের পাঠিয়েছে।

সরকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণের অর্থ ও সামগ্রী বিতরণও শুরু করেছে। রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলা প্রত্যেকে ১০ কোটি নেপালি রুপি করে নগদ সহায়তা পেয়েছে। ধাদিং জেলা পেয়েছে ৫ কোটি রুপি। এছাড়া ১৫টি স্থানীয় ইউনিটের মধ্যে আরও ৬৭ কোটি ৫০ লাখ রুপি বিতরণ করা হয়েছে।

সরকার খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ৩৭টি ট্রাক পাঠিয়েছে। ত্রাণ সরবরাহের জন্য সাতটি হেলিকপ্টার ফ্লাইটও পরিচালনা করা হয়েছে। গতকাল শনিবার উত্তরগয়া ও ধুনচেতে আকাশপথে দুই টন খাদ্য পাঠানো হয়েছে।

উদ্ধারকাজ ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনায় সহায়তা করতে নৌয়াকোটে জ্বালানির মজুতও বজায় রাখছে সরকার। সেখানে ৩৬ হাজার লিটার ডিজেল এবং ২৪ হাজার লিটার পেট্রোল সংরক্ষিত রয়েছে। উদ্ধার অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার লিটার এভিয়েশন ফুয়েল বা বিমান জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে। মজুত রয়েছে আরও ১৪ হাজার লিটার।

এদিকে আজ রবিবার চীন জানিয়েছে, নেপালের সঙ্গে সীমান্তবর্তী একটি স্থলবন্দর এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের পর তিব্বতের অংশে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেপালের নাগরিক, ১০৪ জন। এ ছাড়া ৪৯ জন ভারতীয়, ৩৩ জন লাটভিয়ার, ১৮ জন মার্কিন এবং ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিকেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। চীনা কর্মকর্তারা জানান, বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট বিদেশি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোকে এ বিষয়ে অবহিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর গত শনিবার সামাজিকমাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছে, নেপালকে ৩৬ লাখ ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে তিন মাসের জরুরি খাদ্য সহায়তাও রয়েছে, যা সর্বোচ্চ ১০ হাজার পরিবারকে সহায়তা করবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...