নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তর নিয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মুখোমুখি অবস্থানে। মন্ত্রণালয় থেকে মতামত চাওয়ার পর বিতর্ক আরও বেড়েছে।
নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভূমিমন্ত্রী এবং রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু নেসকোর কার্যালয় রাজশাহীতে রাখার পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কার্যালয়টি বগুড়ায় স্থানান্তরের বিষয়ে জোরালো অবস্থান ধরে রেখেছেন।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে অবস্থিত। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নেসকোর প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনা শুরু হয়।
বগুড়ার শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে কার্যালয় স্থানান্তরের জন্য অনুরোধ জানান। তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। সেসময় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাজশাহীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মানববন্ধন করে এবং রাজনৈতিক নেতারাও প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম তখন জানিয়েছিলেন, আপাতত প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ থেকে সরে এসে তিনি বগুড়ায় একটি আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর আবারও উদ্বেগ দেখা দেয়। গত ১৬ জুলাই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে রাজশাহী থেকে প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। এই চিঠির খবর প্রকাশ হওয়ার পর রাজশাহীর মানুষের মধ্যে ধারণা জন্ম নেয় যে, বিষয়টি এখনো নীরবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, নেসকোর প্রধান কার্যালয় কোনোভাবেই রাজশাহী থেকে সরানো যাবে না। তিনি প্রয়োজনে নিজেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার এই ঘোষণার পর রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, নেসকো ইস্যুতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, "রাজশাহীর মানুষ সারাদিন চিৎকার করে। অথচ পঞ্চগড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিদ্যুৎ সার্ভিস। আপনাদের এত ব্যথা লাগে কেন? ব্যথা লাগাবেন না ভাই। হোক না বগুড়ায় হেড অফিস, আপনারা জোনাল অফিস নেন।"
একই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, "যতই সমালোচনা করেন, পার্লামেন্টে বলেন বা বাইরে বলেন, আমিসহ বগুড়ার সাতজন এমপি বগুড়ার উন্নয়নের ব্যাপারে একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নই।" প্রতিমন্ত্রীর এসব মন্তব্য রাজশাহীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী মহলে এই মন্তব্যের জেরে প্রশ্ন উঠেছে। রাজশাহীর মতো একটি প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ বিভাগীয় শহর থেকে নেসকোর প্রধান কার্যালয় অন্যত্র স্থানান্তরের প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। এটিকে জেলার জনগণের প্রতি সুস্পষ্ট বৈষম্যের শামিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কোনো যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া প্রধান কার্যালয় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ এই অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও স্বার্থের পরিপন্থি বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, নেসকো এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি রাজশাহীর মর্যাদা, প্রশাসনিক গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
মতামত (0)