নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা: অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি দেখছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ

নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা: অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি দেখছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ
নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা: অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি দেখছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে অর্থনীতি, রাজনীতি, সামরিক ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি গতকাল এক গোলটেবিল আলোচনায় এই মন্তব্য করেন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হলে এর সঙ্গে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক, সামরিক ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও জড়িত হবে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এই মন্তব্য করেন। মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি (এমসিআরএস) এই আলোচনার আয়োজন করে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বন্দরের পরিচালনার দক্ষতা বাড়াতে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। কাস্টমস, আমলাতন্ত্র ও অবকাঠামোর সংস্কারের পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, "বিদেশি কোম্পানি আনার অর্থটা এটা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটার যে রাজনৈতিক–সামরিক মাত্রাটাও আছে, সেটাও আমাদের খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।"

আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে বিদেশি স্বার্থের তৎপরতা নতুন নয়। ১৯৯৭ সালে এসএসএ নামের একটি মার্কিন কোম্পানিকে দীর্ঘ মেয়াদে বন্দর ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সে উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার বদলালেও একই ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী কোম্পানি ডিপিওয়ার্ল্ডের কাছে টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ওপর নির্ভরশীল। এর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক, সামরিক ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও জড়িত বলে আনু মুহাম্মদ মন্তব্য করেন।

বিদেশি কোম্পানি এলে সক্ষমতা বাড়বে—এই যুক্তিরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো দেশ নিজস্ব জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করেই বন্দরকে শক্তিশালী করেছে। সরকারের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ তুলে আনু মুহাম্মদ বলেন, বন্দর নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে, সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্য জবাব দিতে হবে।

জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি। চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের অতীতের আন্দোলনকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন। আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারার চুক্তির সঙ্গে জড়িতরা যেন দেশ থেকে বের হতে না পারে।

গোলটেবিল আলোচনায় একটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সোহাগ কুমার বিশ্বাস। প্রবন্ধে বলা হয়, বিষয়টি দেশি না বিদেশি—এই বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে চুক্তির শর্ত, আর্থিক লাভ ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি দেখা জরুরি। এনসিটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে নির্মিত একটি টার্মিনাল। এতে সরকারি বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।

সাম্প্রতিক সময়ে আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন ও ৩৩টি আরটিজি যুক্ত হয়েছে। দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ (২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনার) হ্যান্ডলিং করেছে। এটি জার্মান পরামর্শকের নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।

প্রবন্ধে প্রস্তাবিত কাঠামোর তিনটি পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রথমত, দায়িত্বের ধরন—শুরুতে ‘অপারেটর’, পরে ‘কনসেশনিয়ার’ হওয়ায় মাশুলের অর্থ আর সরাসরি বন্দরের হিসাবে জমা হবে না। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট পার-টিইইউ রাজস্বের বদলে স্তরভিত্তিক রয়্যালটি, যেখানে ‘গড় আয়’ কত দেখানো হবে, তার ওপরই বন্দরের প্রাপ্তির হার নির্ভর করবে। তৃতীয়ত, মেয়াদ—১৫ বছরের আর্থিক মডেলে হিসাব প্রস্তুত হলেও দাবি এখন ৩০ বছরের।

প্রবন্ধে চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর করার যৌক্তিকতা, শর্ত প্রকাশ না করা এবং একই অপারেটরের একাধিক টার্মিনাল পরিচালনার ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ও বন্দরের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

মূল প্রবন্ধে বন্দরের কৌশলগত অবকাঠামো পরিচালনায় উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র, বিদেশি বিনিয়োগে দেশীয় অংশীদারের ৫১ শতাংশ মালিকানা, সর্বোচ্চ ১৫ বছরের মেয়াদ এবং একই অপারেটরকে একাধিক কনটেইনার টার্মিনাল না দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...