নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারকের বিচারিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি উল্লেখ হাইকোর্টের

নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারকের বিচারিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি উল্লেখ হাইকোর্টের
নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারকের বিচারিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি উল্লেখ হাইকোর্টের
নুসরাত জাহান হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বিচারিক সংবেদনশীলতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত রায়ে চার আসামির বিরুদ্ধে ন্যূনতম প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। হাইকোর্টের ১১২ পৃষ্ঠার এই রায়ে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বিচারিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা কোনো সভ্য সমাজে প্রত্যাশিত নয় বলেও পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়।

হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ আলম কাউন্সিলর ও আবছার উদ্দিনের বিরুদ্ধে ন্যূনতম প্রমাণও পাওয়া যায়নি। অথচ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত সাজা প্রদানের কারণে তারা প্রায় সাত বছর ধরে নির্জন কনডেমড সেলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে আরও বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ১৬ দণ্ডিতের মধ্যে এ মামলায় মাত্র দুজনের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার মতো যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে। ট্রাইব্যুনালের ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া রায় দুর্ভাগা ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে।

ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে বিচারিক সংবেদনশীলতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে বলে হাইকোর্ট উল্লেখ করেছেন। রায়ে বলা হয়, দণ্ডবিধি ও দণ্ডাদেশ প্রদানের বিধিমালা সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান অর্জন না করা পর্যন্ত তাঁকে দায়রা এখতিয়ারের বাইরে রাখা উচিত। ওই সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিচারককে সেশনস জুরিসডিকশন (ফৌজদারি এখতিয়ার) থেকে প্রত্যাহার করতে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আলোচিত এই মামলায় বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৪ আগস্ট রায় দেন। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা ও শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ আসামির মধ্যে চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের ও উম্মে সুলতানা।

এছাড়া হাইকোর্টের রায়ে অপর ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের খালাস দেওয়া হয়। খালাসপ্রাপ্তরা হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিল।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর এই মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দিয়েছিলেন। এরপর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি হয়।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা তুলে না নেওয়ায় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। অগ্নিসন্ত্রাসের এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন, যা পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...