ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিনব আয়োজন

ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিনব আয়োজন
ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিনব আয়োজন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ 'চেরিশিং আওয়ার হেরিটেজ' শীর্ষক এক উপভোগ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল উপায়ে ঐতিহ্য উপস্থাপন করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ‘চেরিশিং আওয়ার হেরিটেজ’ নামের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পুরোনো স্থাপনা বা নিদর্শনের বাইরে ঐতিহ্যকে জীবন্ত সংস্কৃতি ও চলমানতা হিসেবে তুলে ধরা ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। প্রথাগত মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার বদলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রয়োগ, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীল উপায়ে ঐতিহ্যকে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করা হয়।

গত মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৪০৬ নম্বর কোর্সের অংশ হিসেবে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। ৫০তম আবর্তন থেকে শুরু হওয়া ‘হেরিটেজ স্টাডিজ’-এর ব্যবহারিক রূপের ধারাবাহিকতায় এবার ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান এই সম্পূর্ণ আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন এবং তাঁকে সহায়তা করেন সহযোগী অধ্যাপক সাবিকুন নাহার সিথি।

৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা বা চিন্তাভাবনা করেননি, বরং নিজেদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে ইতিহাসকে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনুষ্ঠানে ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পরিচালনার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

ইউনেসকোর বিভিন্ন উদ্যোগ, অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচনায় জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি, মসলিন ও শীতলপাটির মতো পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই অধিকারের বিষয়টি বিশেষ স্থান পায়। বক্তারা উল্লেখ করেন, এসব পণ্য শুধু বাণিজ্যিক সামগ্রী নয়, এগুলো আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যভিত্তিক কসপ্লে বা সজ্জাপর্ব। শিক্ষার্থীরা ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে সরাসরি ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করেন। এই পর্বে কেউ হাসন রাজা, কেউ মা মনসা, আবার কেউ রানী ভবানীর মতো ঐতিহাসিক চরিত্রে সেজেছিলেন।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যভিত্তিক আঞ্চলিক খাবারের উপস্থাপনা ছিল, যা শুধু উপস্থাপনা নয়, স্বাদ গ্রহণের সুযোগও তৈরি করে। শিক্ষার্থীরা তাঁদের নিজ নিজ জেলার ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করেন। এটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও ফুটিয়ে তোলে।

অনুষ্ঠানে অতিথিদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ছিল উল্লেখযোগ্য। অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান হেরিটেজ ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণের পুরোনো ধারণার বদল এবং নতুন ন্যারেটিভ নিয়েও আলোচনা করেন।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনেসকো কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ টু বাংলাদেশ ও হেড অব অফিস ড. সুসান ভাইজ। তিনি ডকুমেন্টেশন বা তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ, গবেষণা, আলোচনা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, যেকোনো সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক পন্থায় প্রামাণ্য দলিল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ ইউনেসকো জাতীয় কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল সাবভিনা মনির তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি এই অনুষ্ঠানের কার্যকারিতা তুলে ধরার পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগে সহায়তার কথাও উল্লেখ করেন।

একজন ফ্যাশন বিষয়ক পরামর্শক শেখ সাইফুর রহমান ডকুমেন্টেশন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। তিনি ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে ঐতিহ্যের নানা উপাদান সবার সামনে তুলে ধরার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, ডিজিটাল মাধ্যম ও সঠিক ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমেই আমাদের শিকড়ের ঐতিহ্যকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় ও প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানের বিশেষ বক্তব্যে একজন ডিজিটাল প্রকাশনার সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘ বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করার ক্ষেত্রে এমন অভিনব আয়োজনগুলো একটি চমৎকার মাইলফলক।

কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোজাম্মেল হক এবং ঐতিহ্যভিত্তিক উদ্যোক্তা ফোয়ারা ফেরদৌস, পৃথিলা শাহনেওয়াজ ও ইশরাত নশিনও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, চর্চা এবং এর নান্দনিক প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মালিহা নার্গিস আহমেদ। এমন আয়োজনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বসিত ছিলেন। দেশীয় ঐতিহ্য ও হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে নিজেদের হাত ধরে সবার মাঝে ফিরিয়ে আনতে পেরে তাঁরা নিজেদের গর্বিত মনে করেছেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...