অস্ট্রেলিয়ার নতুন অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ
সম্পাদক১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · 1 ঘণ্টা আগে
অস্ট্রেলিয়ার নতুন অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ
অস্ট্রেলিয়া সরকার অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক কঠোরতা আরোপ করেছে, যার ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা পরিবর্তন ও পরিবার আনার সুযোগ সীমিত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়া সরকার অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক কঠোরতা আরোপ করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী টনি বার্ক নতুন বিধিনিষেধের রূপরেখা তুলে ধরেন। বৃহস্পতিবার ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই ঘোষণা দেন। মূলত বিদেশি শিক্ষার্থীদের এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় যাওয়ার সুযোগ এবং পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
ভ্রমণ ভিসার অপব্যবহার রোধেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া শিক্ষার্থীরা এই নীতি নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। আগের দিন বুধবারই অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের রদবদলের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র আবাসনসংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার রাজনৈতিক চাপের মুখে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
মন্ত্রী টনি বার্ক তার বক্তৃতায় জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বার্ষিক নিট অভিবাসীর সংখ্যা ২ লাখ ৪৫ হাজারে নামিয়ে আনা হবে। এরপরের বছরগুলোয় এই সংখ্যা আরও কমিয়ে বছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি ‘অভিবাসন কর্মসূচি পরিচালনা: কারা আসবেন, কারা থাকবেন, কারা চলে যাবেন’ শীর্ষক আলোচনায় এই তথ্য দেন।
অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আগের এক বছরে দেশটিতে নিট অভিবাসন কমে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০-তে দাঁড়িয়েছে। এই সংখ্যা ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বনিম্ন এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম।
নতুন নীতিমালায় ‘ভিসা হপিং’ বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ভিসা হপিং হলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা শেষ করে নিম্নমানের কোর্সে ভর্তি হওয়া বা বারবার ভিসা পরিবর্তন করা। একই সঙ্গে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত করা হচ্ছে।
টনি বার্ক উল্লেখ করেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের অস্ট্রেলিয়ায় পরিবার নিয়ে আসার সুযোগ আর বাড়ানো হবে না। তবে ইতিমধ্যে যাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন, তাঁরা এই নিয়মের আওতামুক্ত থাকবেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আবেদনকারীরাও ছাড় পাবেন। পিএইচডির শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে পরিবার আনতে পারবেন।
ভ্রমণ ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে অবস্থান দীর্ঘায়িত করার পথ বন্ধ করতে সব ধরনের পর্যটন ভিসায় ‘অতিরিক্ত অবস্থানের সুযোগ নেই’ (নো ফারদার স্টে)—এমন শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে পর্যটক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সেখানে অন্য ভিসায় আবেদন করার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। যাঁদের ভিসার বৈধ মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাঁদের দ্রুত দেশত্যাগে বাধ্য করতে নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।
কৃষি ও সেবা খাতের ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ভিসার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের অনুমোদনের ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালু করা হবে। নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি খাতের মতো শ্রমঘাটতিতে থাকা ক্ষেত্রগুলোয় দক্ষ অভিবাসনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিশুদের ওপর সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন এবং বিদ্বেষমূলক অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের ভিসা দ্রুত বাতিল ও তাঁদের বহিষ্কারে অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখতে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন, তাঁদের স্বাগত জানানো হবে। তবে অভিবাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অন্যায্য সুযোগ নেওয়া বরদাশত করা হবে না।
সরকারের অভিবাসন সংকোচনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণ বিদেশি শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল করেন। সিডনির বিখ্যাত হাইড পার্কসহ মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনের মতো প্রধান শহরগুলোয় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও গভীর উৎকণ্ঠা কাজ করছে। সিডনির ড্যানহ্যাম কোর্ট এলাকার এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা বিশাল অঙ্কের টিউশন ফি দিয়ে বৈধভাবে পড়াশোনা করতে এসেছি। কিন্তু যেভাবে ঘন ঘন নিয়ম বদলানো হচ্ছে এবং এক কোর্স বা ভিসা থেকে অন্যটিতে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, এতে আমাদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।” লাকেম্বা শহরের এক শিক্ষার্থীও একই ধরনের শঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, অস্থায়ী ভিসায় যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে এখানে বসবাস করছেন, তাঁদের জন্য এই পরিবর্তনগুলি দুশ্চিন্তার কারণ।
মতামত (0)