পদ্মার চরে পানি বৃদ্ধি, আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন হাজারো মানুষ
সম্পাদক৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · 1 ঘণ্টা আগে
পদ্মার চরে পানি বৃদ্ধি, আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন হাজারো মানুষ
রাজশাহীর পবা উপজেলার চর খিদিরপুরসহ বিভিন্ন চরে পদ্মার পানি বেড়ে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাচ্ছে। বাসিন্দারা গবাদিপশুসহ শহরের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছেন।
রাজশাহীর পবা উপজেলার চর খিদিরপুরের মিডিল চরের অনেক বাড়ির উঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু বাড়ির উঠান শুকনো থাকলেও চারপাশ ঘিরে রেখেছে পানি। পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় চরের বাসিন্দারা নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহরের দিকে যাচ্ছেন।
চরের বাসিন্দারা তাদের শেষ সম্বল গবাদিপশুগুলোকে সঙ্গে নিচ্ছেন। আজ বুধবার দুপুরে নৌকায় গাদাগাদি করে গরু, ধান, জাল ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল পদ্মার ওপারের চর থেকে শহরের পারে। কোনো নৌকায় ৫-৭টি গরু, আবার কোনোটিতে ২৫-৩০টি গরু দেখা গেছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চর খিদিরপুরের মিডিল চরের পরিস্থিতি এখন এমনই। কোথাও ঘরের ভেতর পানি ঢুকে যাচ্ছে। কোথাও আবার পানির মধ্যেই গবাদিপশু বেঁধে রেখেছেন বাসিন্দারা।
রান্নার সুযোগ না থাকা, খাবারের সংকট এবং গরু-ছাগল রাখার নিরাপদ জায়গার অভাবে কয়েক দিন ধরে মানুষ চর ছাড়ছে। আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চর খিদিরপুরের মিডিল চরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বাড়ির উঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। যেকোনো সময় সেখানেও পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
চরের বাসিন্দারা রাত কাটাচ্ছেন উৎকণ্ঠায়, এর মধ্যে সাপের ভয়ও বেড়েছে। মো. রাকিব নামের এক চরের বাসিন্দা জানান, তার প্রায় ৫০টি গরুর মধ্যে ৪০টি নৌকায় করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে এসেছেন। রাকিব বলেন, "চরে থাকবার কোনো অবস্থা নেই। সব বাড়িঘর ডুইবে গিয়েছে। গরু নিয়ে বইসে আছি। খুব কষ্টের মধ্যে আছি ভাই। আমাদের একটু সাহায্য করলি ভালো হয়।"
চরবাসীর অনেকেরই জীবিকার প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু। কারও ৫০টি, কারও ৬০টি, কারও শতাধিক, আবার কারও কয়েকটি গরু-ছাগল রয়েছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হলেও এসব পশু ফেলে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি নৌকায় ২৫-৩০টি গরু আনা হচ্ছে এবং যার যত গবাদিপশু, সামর্থ্য অনুযায়ী সেগুলো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
মনোয়ারা বেগম নামের এক চরের বাসিন্দা অসহায় হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, "আমার সব ডুইবে গেছে। তো শহরে জাগা নাই গো। জাগা না থাকলে কার বাড়িতে উইঠব? গরু-ছাগল রাখবার জাগা নাই। গরু শুইতে পারছে না। সকাল থেইক্যে এখনও পর্যন্ত খাইনি। এই যে গরু-ছাগলকে কী খাইতে দিব, সেটাই বুঝতে পারছি নে।"
চর থেকে শহরে আসতেও নৌকার ভাড়া দিতে হয়, সেই টাকাও অনেকের হাতে নেই। মনোয়ারা জানান, টাকা থাকলে তাঁরা গবাদিপশু নিয়ে আগেই নিরাপদ জায়গায় চলে আসতেন। স্বামীহারা মরিয়ম বেগমও আজ বুধবার সন্তানদের নিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি নৌকায় বসে বলেন, কয়েক দিন ধরে তাঁরা পানির মধ্যে দুর্ভোগে আছেন এবং গবাদিপশুগুলোও পানিতে দাঁড়িয়ে আছে।
চরের বাসিন্দা মো. রেজাউল জানান, বর্ষা এলেই তাঁদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়। দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত কষ্ট করে থাকতে হয়। এবারও নদীর পানি বাড়ায় চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেড়েছে সাপের উপদ্রব এবং গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে গেছে।
রেজাউল আরও বলেন, এত দিন তাঁরা সরকারি কোনো সহায়তা পাননি। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ার কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন। চর খিদিরপুরের এই চরে দুই শতাধিক বাড়ি রয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম জানান, সেখানে প্রায় ১০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে।
পানি বাড়তে থাকায় এসব পশুর নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরের বাসিন্দারা জানান, প্রায় ১৫ দিন ধরে পানি বাড়ছে। পানি না কমা পর্যন্ত তাঁদের আরও কয়েক মাস দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এর মধ্যে অনেকে ধান, জ্বালানি, প্রয়োজনীয় মালামাল, সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে চর ছাড়ছেন।
শুধু চর খিদিরপুর নয়, রাজশাহীর চর খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর ও চর আষাড়িয়াদহেও পানি বাড়ায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। পদ্মাঘেঁষা রাজশাহী শহরের নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। নগরের তালাইমারী শহীদ মিনার এলাকায় রাজশাহী আলোর পাঠশালার মাঠও জলমগ্ন হয়েছে।
রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানির বিপৎসীমা ১৮ দশমিক শূন্য ৫ মিটার। আজ বুধবার দুপুরে পানি ১৬ দশমিক ৮৫ মিটার পর্যন্ত উঠেছে। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি ফারাক্কার উজানে গঙ্গার বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠেছে। সেই পানি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দিকে আসছে।
প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম আরও বলেন, রাজশাহীতে পদ্মার পানি আরও বাড়তে পারে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আজ বুধবার দুপুরে পাঁচ শতাধিক মানুষকে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়েছে।
মতামত (0)