বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে যোগ দিয়ে ফেরান তোরেস মাত্র ৬ ম্যাচে ৭ গোল করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বদলি হিসেবে নেমেও তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ জয়ে অবদান রাখছেন।
পিএসজির হয়ে ফেরান তোরেস এখন পর্যন্ত মোট ৩২৫ মিনিট মাঠে ছিলেন। এই সময়ে তিনি গোলমুখে সাতটি শট নিয়েছেন, যার সবকটিই গোলে পরিণত হয়েছে। ছয়টি ম্যাচে মাঠে নেমে তিনি সাতটি গোল করেছেন।
একজন নাম্বার নাইনের কাছে দল সাধারণত এমন পারফরম্যান্সই আশা করে। বিশেষ করে যদি সেই খেলোয়াড় মূল স্ট্রাইকার না হয়ে বদলি হিসেবে খেলেন, তাহলে এই পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তোরেস পিএসজিতে সেই ভূমিকাতেই খেলছেন।
বিশ্ব ফুটবলে তোরেস এখনো পুরোপুরি বড় তারকা হিসেবে পরিচিতি পাননি। তবে দুই মাস আগে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের হয়ে জয়সূচক একমাত্র গোলটি তাঁরই ছিল। সেই ম্যাচেও তিনি ম্যাচসেরার পুরস্কার পান। ওই ফাইনালেও স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের প্রথম পছন্দের তালিকায় তিনি ছিলেন না, ৬২ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন।
বিশ্বকাপে এমন কীর্তি গড়ার পরও রদ্রি বা ইয়ামালদের মতো তারকাখ্যাতি পাননি তোরেস। কিছুটা নীরবেই তিনি এই নতুন মৌসুমে বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিসে পিএসজিতে যোগ দেন। পিএসজিও তাঁকে বরণ করে নিতে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন করেনি। কোচ লুইস এনরিকে তাঁকে মূল দলের বিকল্প হিসেবেই দলে নিয়েছিলেন।
প্যারিসে পা রাখার পর তোরেস অবশ্য বিকল্প হয়ে থাকতে চাননি। লিগ আঁ-তে রেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই বদলি নেমে তিনি জোড়া গোল করেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির জার্সিতে অভিষেকেই তিনি হ্যাটট্রিক করেন।
বার্সেলোনার সেই তোরেসের চেয়ে প্যারিসের তোরেস যেন আরও ধারালো ও নির্দয় হয়ে উঠেছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি লুইস এনরিকের আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়েছেন। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এই মৌসুমে তিনি পিএসজির হয়ে ছয়টি ম্যাচে মাঠে নেমেছেন।
গতকাল রাতে মার্শেইয়ের বিপক্ষে ক্লাসিকো ম্যাচে পিএসজি গোল পাচ্ছিল না। কোচ এনরিকের তখন এমন একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন ছিল, যিনি গোল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারবেন। ৫৯ মিনিটে তোরেসকে বদলি হিসেবে নামানো হয়।
মাঠে নামার সাত মিনিটের মাথায় ৬৬ মিনিটে তিনি গোল করে পিএসজিকে এগিয়ে দেন। ছয় মিনিট পর মার্শেই অ্যাঞ্জেল গোমেসের গোলে সমতায় ফেরে। তবে সেই সমতা মাত্র তিন মিনিট টিকেছিল। ৭৫ মিনিটে মার্কিনিওস গোল করে পিএসজিকে আবার এগিয়ে দেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধানেই জয় নিশ্চিত হয়।
এই জয় শুধু পিএসজিকে তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, মৌসুমের শুরুর দিকের জড়তা কাটিয়ে ওঠার আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা তিন জয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পিএসজি আবার ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে, আর সেই ছন্দের কেন্দ্রে রয়েছেন তোরেস।
পিএসজিতে দুর্দান্ত শুরুর বিচারে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ ছাড়া আর কেউ তোরেসের চেয়ে এগিয়ে নেই। তোরেস নিজে অবশ্য সংখ্যার মোহে ভাসতে চান না। তিনি বলেছেন, “সুযোগ পেলে কাজে লাগাতে হয়। কখনো ভাগ্য সহায় হয়, কখনো হয় না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয় বারবার।”
তবে এই পরিসংখ্যান কেবল ভাগ্যের গল্প নয়। বক্সে সঠিক অবস্থান নেওয়া, সতীর্থদের মুভমেন্ট বোঝা, ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং শেষ ছোঁয়ার নির্ভুলতা—সব মিলিয়ে তিনি একজন নিখুঁত স্ট্রাইকারের মতো খেলছেন, যা একজন কোচ চান।
তোরেসের এমন পারফরম্যান্স কোচ এনরিকেওকে দোটানায় ফেলেছে। পিএসজির আক্রমণভাগে উসমান দেম্বেলে, খিচা কাভারাস্কেইয়া, দেজিরে দুয়ের মতো তারকারা রয়েছেন। সেখানে বেঞ্চের বিকল্প হিসেবে প্যারিসে আসা তোরেস এখন শুরুর একাদশের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন। চার গোল নিয়ে তিনি এখন লিগ আঁ-তে দলটির শীর্ষ গোলদাতা।
এনরিকেও এই নতুন ফরোয়ার্ডকে নিয়ে সন্তুষ্টির কথা গোপন রাখেননি। তিনি বলেছেন, “নতুন যারা এসেছে, সবাই দলকে সাহায্য করছে। বিশেষ করে ফেরান অসাধারণ খেলছে। ডিফেন্সের পেছনে ফাঁকা জায়গা বের করা এবং তা কাজে লাগানোর চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে তার। মাঝমাঠে যখন ওর মতো খেলোয়াড় থাকে, খেলা সহজ হয়ে যায়। ও এখন নিজের সেরা ছন্দে আছে।”
তোরেস নিজেও শুরুর একাদশে নিয়মিত না থাকা নিয়ে কথা বলতে খুব একটা আগ্রহী নন। তাঁর হয়ে সংখ্যাই কথা বলছে এবং এনরিকেওর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পিএসজি কোচের পক্ষে এই চাপ খুব বেশি দিন উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না বলেই মনে হচ্ছে।
মতামত (0)