প্রেমের টানে চীন থেকে নেত্রকোণায়: ওয়্যাং সুলিন থেকে মো. নুর উদ্দিন, এক আন্তঃদেশীয় বিবাহের গল্প

প্রেমের টানে চীন থেকে নেত্রকোণায়: ওয়্যাং সুলিন থেকে মো. নুর উদ্দিন, এক আন্তঃদেশীয় বিবাহের গল্প
প্রেমের টানে চীন থেকে নেত্রকোণায়: ওয়্যাং সুলিন থেকে মো. নুর উদ্দিন, এক আন্তঃদেশীয় বিবাহের গল্প
প্রেমের টানে চীন থেকে নেত্রকোণায় তরুণ, ধর্ম বদলে বিয়ে ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৫ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা প্রেম পরিণয়ে রূপ নিল। দীর্ঘ দূরত্ব পেরিয়ে ভালোবাসার টানে সুদূর চীন থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন ৩০ বছর বয়সী চীনা যুবক ওয়্যাং সুলিন। শুধু আসাই নয়, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেত্রকোণার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক ব্যতিক্রমী প্রেমকাহিনি সম্প্রতি পরিণয়ে রূপ নিয়েছে, যা নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য টানে সুদূর চীন থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন ৩০ বছর বয়সী চীনা যুবক ওয়্যাং সুলিন, যিনি নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের স্নাতক পড়ুয়া তরুণী নাজমিন আক্তার লিজাকে (২০) বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। মুসলিম হওয়ার পর এই চীনা যুবকের নতুন নাম রাখা হয়েছে মো. নুর উদ্দিন, যা এই আন্তর্জাতিক ভালোবাসার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

কনে নাজমিন আক্তার লিজা মোহনগঞ্জ সরকারি কলেজের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী, যার বাবা মো. নাজিম উদ্দিন পেশায় একজন আসবাবপত্র ব্যবসায়ী। পারিবারিকভাবে তাদের মূল বাড়ি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ভাটগাঁও গ্রামে হলেও, তারা দীর্ঘকাল ধরে মোহনগঞ্জ পৌর শহরের দৌলতপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। অপরদিকে, বর ওয়্যাং সুলিন চীনের লুবেই প্রদেশের লুরাং শহরের বাসিন্দা এবং নিজ দেশে ভাইয়ের সঙ্গে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনা করেন।

প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে লিজা ও সুলিনের প্রথম পরিচয় হয় এবং এরপর তাদের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে এতটাই গভীর হয় যে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন, এবং বিষয়টি দুই পরিবারের কাছে জানালে উভয়পক্ষই এতে সম্মতি জানায়। প্রেমিকার ডাকে সাড়া দিয়ে গত ১৮ জুলাই সুলিন চীন থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান, যেখানে লিজার স্বজনেরা তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে মোহনগঞ্জে নিয়ে যান।

পরবর্তীতে ২১ জুলাই স্থানীয় আইনজীবীর মাধ্যমে ধর্মান্তর ও বিয়ের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, যেখানে এফিডেভিট করে এই আন্তঃদেশীয় বিবাহকে বৈধতা দেওয়া হয়। এই আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণ করতে কনেপক্ষ আগামী ৩১ জুলাই (শুক্রবার) মোহনগঞ্জে একটি জমকালো বিয়ের আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার প্রস্তুতি হিসেবে বর্তমানে প্যান্ডেল নির্মাণ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে কার্ড বিতরণের কাজ পুরোদমে চলছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি পাত্রদের ক্ষেত্রে প্রতারণার নানা খবর প্রকাশিত হওয়ায় কনের পরিবার এই বিষয়ে বেশ সতর্ক ছিল। লিজার বাবা নাজিম উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, ছেলের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তারা চীনা দূতাবাসে গিয়েও যাবতীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করেছেন। সবকিছু সঠিক পাওয়ার পর এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে নিশ্চিত হয়েই তারা বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। নবদম্পতি এমপি সাহেবের সঙ্গে দেখাও করেছেন, যা তাদের এই নতুন জীবনের যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন হিসেবে কাজ করেছে।

বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে মো. নুর উদ্দিন চীনে ফিরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসা প্রস্তুত করে লিজাকে নিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন। এই বিয়ের ঘটনাকে ঘিরে মোহনগঞ্জজুড়ে এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় উৎসুক মানুষ প্রতিনিয়ত লিজাদের বাড়িতে ভিড় করছেন নতুন জামাইকে এক নজর দেখতে এবং তাদের সঙ্গে ছবি তুলতে, যা এই ব্যতিক্রমী মিলনকে ঘিরে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

এই আন্তঃদেশীয় ও আন্তঃধর্মীয় বিবাহ মূলত ইসলাম ধর্মের বিবাহ নীতির একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরে। ইসলামে বিবাহের জন্য কনে ও বরের মুসলিম হওয়া পূর্বশর্ত, অথবা মুসলিম পুরুষের ক্ষেত্রে আহলে কিতাব (ইহুদি বা খ্রিস্টান) নারীর সঙ্গে বিবাহ বৈধ। যেহেতু লিজা মুসলিম, তাই ওয়্যাং সুলিনের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মো. নুর উদ্দিন হওয়াটা এই বিবাহের বৈধতার জন্য অপরিহার্য ছিল।

ইসলামী শরিয়তে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য অভিভাবকের অভিমত এবং দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে লিজার বাবা নাজিম উদ্দিনের সম্মতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধর্মান্তর ও বিয়ের সম্পাদন, এই বিয়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বৈধতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদের বিয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা মানবজীবনে পবিত্রতা ও সংযম বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ইসলামে বিবাহের মাধ্যমে শুধু দুটি মানুষের মিলন হয় না, বরং এটি তাদের দ্বীনের অর্ধেক পূরণ করে। একজন আদর্শ স্বামী হিসেবে যে গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, যেমন স্ত্রীকে বোঝার চেষ্টা করা, তার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা, ঘরের কাজে সহযোগিতা করা, স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করা এবং তার পরিবারকে সম্মান করা— এসবই নবদম্পতির সুখী দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি স্থাপন করবে। এই ক্ষেত্রে মো. নুর উদ্দিনের নতুন ধর্ম গ্রহণ এবং লিজার পরিবারের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দৃঢ়তার ইঙ্গিত দেয়।

এই ঘটনাটি আধুনিক বিশ্বে প্রেমের শক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকে তুলে ধরে, যা ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষকে এক করে। একইসাথে, এটি ধর্মীয় রীতিনীতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নেত্রকোণার এই প্রেমের গল্প শুধু একটি বিয়ের খবর নয়, বরং এটি মানবীয় সংযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সহনশীলতার এক সুন্দর বার্তা বহন করে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...