রেজা সেলিমের দুই দশকের বেশি সময়ের আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট যাত্রা

রেজা সেলিমের দুই দশকের বেশি সময়ের আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট যাত্রা
রেজা সেলিমের দুই দশকের বেশি সময়ের আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট যাত্রা
রেজা সেলিম দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে 'উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি' ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি 'আমাদের গ্রাম' প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তি প্রসারে ভূমিকা রেখেছেন।

রেজা সেলিম আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে 'উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি' ধারণায় কাজ করে আসছেন। তিনি বাংলাদেশে গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে যাওয়া এবং এ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা করার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি। ৪ সেপ্টেম্বর একটি সাক্ষাৎকারে তিনি গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, ক্যানসার প্রতিরোধে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং জ্ঞানমেলা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি 'আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প' এবং 'আমাদের গ্রাম ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক' হিসেবে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

'আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প' বা আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট ২০০০-০১ সালের দিকে শুরু হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কাছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রচার করা এবং সাধারণ মানুষকে এর সুবিধা দেওয়া। তখন অবকাঠামোগত চিন্তার পাশাপাশি কম্পিউটার কীভাবে সাশ্রয়ী উপায়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, তা নিয়ে কাজ করা হয়।

সেই সময় কম্পিউটার অনেক ব্যয়বহুল ছিল। ইন্টারনেট ছিল ডায়ালআপ পদ্ধতির মাধ্যমে। এসব খরচ কমানো এবং প্রযুক্তিকে সাশ্রয়ী রাখার উপায় নিয়েই উন্নয়নের চিন্তা করা হয়। ই-রেডিনেস ছিল মূল ফোকাস, কারণ তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল সম্ভাবনা উপলব্ধি করা গিয়েছিল।

তখন একটি বিতর্ক ছিল যে, কম্পিউটারের সম্ভাবনা শুধু করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে। ২০০০ সালে জাপানের ওকিনাওয়ায় জি-৮ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ডট ফোর্স (ডিজিটাল অপরচুনিটি টাস্কফোর্স) গঠিত হয়।

ওকিনাওয়া ঘোষণায় পৃথিবীর আটটি বড় ধনী দেশ তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের প্রস্তাবে এবং জাপানের সমর্থনে সিদ্ধান্ত হয় যে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্ভাবনা উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা হবে। তখনো প্রযুক্তিবিদদের কাছেও এই ধারণা পরিষ্কার ছিল না।

এটি মানুষকেন্দ্রিক করার জন্য বিতর্ক শুরু হয়। ডট ফোর্সকে ২০০১ সালের জি-৮ সম্মেলনে (ইতালির রেনোয়া শহরে) একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। বিশ্বব্যাংকে ডট ফোর্সের সচিবালয় ছিল এবং কানাডা এর পৃষ্ঠপোষক ছিল।

জি-৮ এর কনসালটেশনে রেজা সেলিম যুক্ত ছিলেন। প্রথমে কানাডায় জিকে-১ (গ্লোবাল নলেজ) এবং পরে মালয়েশিয়ায় জিকে-২ বৈঠক হয়। সেই বৈঠক দুটি থেকে 'উন্নয়নের জন্য আইসিটি' ধারণার সুপারিশ করা হয়।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) যুক্ত হয়। এরপর ২০০৩ সালে জেনেভায় এবং ২০০৫ সালে তিউনিসে জাতিসংঘের তথ্যসমাজ শীর্ষ সম্মেলন (ডব্লিউএসআইএস) অনুষ্ঠিত হয়। জিকেপির দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বয়কারী এবং বাংলাদেশ সরকারের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে রেজা সেলিম যুক্ত ছিলেন।

এই অভিজ্ঞতার কারণে ২০০১ সাল থেকে 'আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প' শুরু করা সহজ হয়েছিল। রামপালকে প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়ার মূল কারণ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী মাহমুদুল হক। তার গ্রাম ছিল বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা।

প্রথমে কুমিল্লার গ্রামেও কাজ শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা যায়, কুমিল্লার গ্রাম বাগেরহাটের গ্রামের চেয়ে তুলনামূলক অগ্রসর। এ কারণে বাগেরহাটের রামপালকেই বেছে নেওয়া হয়। ২০০০ সালের দিকে রামপাল ঢাকা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে ছিল। যশোর-খুলনা হয়ে সেখানে যেতে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগত।

শুরুতে প্রকল্পে ডেটা এন্ট্রি করে ডেটাবেজ তৈরি করা হতো। এতে গ্রামের একটি ডেটাবেজ তৈরি হয়, যেখানে স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন তথ্যসহ অন্যান্য তথ্য থাকত। গ্রামের ছেলেমেয়েরা তখন কম্পিউটার শিখতে আসত।

তারা এক্সেল, ওয়ার্ড এবং মাইক্রোসফট অ্যাকসেস শিখত। নিজেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের ডেটা একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে এনে এন্ট্রি করে অনুশীলন করত। এর ফলে একটি বড় ডেটাবেজ তৈরি হয়, যা থেকে জ্ঞানকেন্দ্র বা নলেজ সেন্টারের ধারণা উন্নত হয়।

স্কুলগুলোতেও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য স্কুলগুলোকে ল্যাবরেটরি করে দিতে সহায়তা করা হতো। কম্পিউটার শিক্ষক এনে দেওয়া এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া— এভাবেই পুরো আন্দোলনটি পরিচালিত হয়, যাতে সবাই কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...