দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন বহুমুখী সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই আশার সবচেয়ে বড় প্রদীপ হয়ে জ্বলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। এই প্রবাসী আয় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা, আমদানি জটিলতা এবং ডলার সংকটের মুহূর্তে অর্থনীতির মেরুদণ্ড সোজা করে রেখেছে, কিন্তু এই অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির পেছনে থাকা প্রবাসীরা প্রায়শই অবহেলার শিকার হন। নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহে এক অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের কেবল প্রথম ১৪ দিনেই দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। এর আগে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন রেকর্ড ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, মোট রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছালেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
দেশের প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বর্তমানের চরম অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং তাদের পাঠানো অর্থের প্রায় ৬০ শতাংশ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হয়ে দেশের তৃণমূলের চিত্র বদলে দিচ্ছে। এই বিশাল অংশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য।
তবে এই আশাজাগানিয়া খবরের ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চরম ভঙ্গুর দশা এবং ব্যাংক খাতের সীমাহীন নৈরাজ্য। একদিকে প্রবাসীদের পাঠানো ডলারে রিজার্ভ কিছুটা পুষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ২৭ শতাংশ; অর্থাৎ ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ২৭ টাকার বেশি অর্থ খেলাপির খাতায় চলে গেছে।
শেয়ারবাজারের অবস্থাও অত্যন্ত করুণ; মিউচুয়াল ফান্ড ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। এর বাইরে রেমিট্যান্স প্রবাহের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হুন্ডি নামের অনানুষ্ঠানিক লেনদেন ব্যবস্থা, যা বর্তমানে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ব্যাংকে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়া এবং হুন্ডিতে ডলারের বিনিময় মূল্য বেশি পাওয়ার কারণে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলের বদলে অবৈধ পথের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
দালাল চক্রের মাধ্যমে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়া, বিমানবন্দরে পদে পদে হয়রানি এবং প্রবাসে গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন—এসবই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের নিত্যদিনের কঠিন বাস্তবতা। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা প্রায় নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এসব অভিজ্ঞতার কারণে অনেকে বৈধ পথে টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতি, রেমিট্যান্সের উত্থান এবং কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়ে অর্থনীতিবিদ, বাজার বিশ্লেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত গভীর ও সুনির্দিষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্সের বর্তমান উল্লম্ফনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে, যার মধ্যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হুন্ডিবিরোধী কঠোর অবস্থান, বৈধ পথে অর্থ পাঠালে আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রদান এবং ডলারের বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল রাখা অন্যতম। এই পদক্ষেপগুলো প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে।


মতামত (0)