রেমিট্যান্সের প্রাণশক্তি: প্রবাসীদের অবহেলা ও হুন্ডির আবর্তে দেশের অর্থনীতি

রেমিট্যান্সের প্রাণশক্তি: প্রবাসীদের অবহেলা ও হুন্ডির আবর্তে দেশের অর্থনীতি
রেমিট্যান্সের প্রাণশক্তি: প্রবাসীদের অবহেলা ও হুন্ডির আবর্তে দেশের অর্থনীতি
রেমিট্যান্সে অর্থনীতি বাঁচলেও অবহেলায় প্রবাসীরা শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম আইসিটি এন্ড ক্যারিয়ার ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০২ এএম | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০২ এএম দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন বহুমুখী সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই আশার সবচেয়ে বড় প্রদীপ হয়ে জ্বলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। নতুন অর্থবছ

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন বহুমুখী সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই আশার সবচেয়ে বড় প্রদীপ হয়ে জ্বলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। এই প্রবাসী আয় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা, আমদানি জটিলতা এবং ডলার সংকটের মুহূর্তে অর্থনীতির মেরুদণ্ড সোজা করে রেখেছে, কিন্তু এই অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির পেছনে থাকা প্রবাসীরা প্রায়শই অবহেলার শিকার হন। নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহে এক অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের কেবল প্রথম ১৪ দিনেই দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। এর আগে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন রেকর্ড ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, মোট রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছালেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

দেশের প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বর্তমানের চরম অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং তাদের পাঠানো অর্থের প্রায় ৬০ শতাংশ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হয়ে দেশের তৃণমূলের চিত্র বদলে দিচ্ছে। এই বিশাল অংশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য।

তবে এই আশাজাগানিয়া খবরের ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চরম ভঙ্গুর দশা এবং ব্যাংক খাতের সীমাহীন নৈরাজ্য। একদিকে প্রবাসীদের পাঠানো ডলারে রিজার্ভ কিছুটা পুষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ২৭ শতাংশ; অর্থাৎ ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ২৭ টাকার বেশি অর্থ খেলাপির খাতায় চলে গেছে।

শেয়ারবাজারের অবস্থাও অত্যন্ত করুণ; মিউচুয়াল ফান্ড ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। এর বাইরে রেমিট্যান্স প্রবাহের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হুন্ডি নামের অনানুষ্ঠানিক লেনদেন ব্যবস্থা, যা বর্তমানে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ব্যাংকে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়া এবং হুন্ডিতে ডলারের বিনিময় মূল্য বেশি পাওয়ার কারণে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলের বদলে অবৈধ পথের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

দালাল চক্রের মাধ্যমে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়া, বিমানবন্দরে পদে পদে হয়রানি এবং প্রবাসে গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন—এসবই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের নিত্যদিনের কঠিন বাস্তবতা। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা প্রায় নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এসব অভিজ্ঞতার কারণে অনেকে বৈধ পথে টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি, রেমিট্যান্সের উত্থান এবং কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়ে অর্থনীতিবিদ, বাজার বিশ্লেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত গভীর ও সুনির্দিষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্সের বর্তমান উল্লম্ফনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে, যার মধ্যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হুন্ডিবিরোধী কঠোর অবস্থান, বৈধ পথে অর্থ পাঠালে আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রদান এবং ডলারের বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল রাখা অন্যতম। এই পদক্ষেপগুলো প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে।

তবে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মালদ্বীপের মতো ছোট দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৬৬ শতাংশই হুন্ডিতে টাকা পাঠায় এবং তাদের ৬৪ শতাংশের কোনো ব্যাংক হিসাবই নেই। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকার যখন কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম ধরে রাখার চেষ্টা করে এবং মূল্যস্ফীতির দোহাই দিয়ে সুদের হার ৯-৬ এ বেঁধে দেয়, তখন খোলাবাজারে ডলারের দাম অনেক বেড়ে যায়; এই সুযোগটিই লুফে নেয় হুন্ডি কারবারিরা। বিশ্বব্যাংকও তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে, আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ চাপে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচারকারীরাই মূলত হুন্ডি ব্যবসায়ীদের অর্থের জোগানদাতা; দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ বিদেশে বসে হুন্ডি চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়, আর সেই সমপরিমাণ টাকা দেশে প্রবাসীর পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আর ঢুকতে পারে না, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে চরম বাঁধার সম্মুখীন করে। এটি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর সমস্যা, কারণ এটি কেবল ডলার সংকট বাড়ায় না, বরং অবৈধ অর্থ প্রবাহকেও উৎসাহিত করে।

দীর্ঘমেয়াদে কেবল রেমিট্যান্সের ওপর অর্থনীতির এই অতি-নির্ভরশীলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সতর্ক করে বলেছেন যে, এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ বিদেশে চলে গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে শূন্যতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্পায়ন, উৎপাদন এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উচিত এখন অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে কারিগরি জ্ঞান, ভাষা-দক্ষতা ও পেশাগত প্রশিক্ষণসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে মনোযোগ দেওয়া। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এখন নার্সিং, কেয়ারগিভিং, আইটি এবং টেকনিক্যাল কাজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যেখানে দক্ষ জনশক্তি পাঠিয়ে বাংলাদেশ উচ্চ রেমিট্যান্সের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে।

এদিকে ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা সংস্কার নিয়ে কঠোর মতামত দিয়েছেন। তারা মনে করেন, ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত করে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন করে বা প্রণোদনা দিয়ে হুন্ডি ঠেকানো যাবে না, বরং প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সেবা এতটাই সহজ ও লাভজনক করতে হবে যেন তারা নিজেরাই হুন্ডি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এছাড়া বিদেশের মাটিতে শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা ও বিপদে দ্রুত সহায়তা প্রদানের জন্য দূতাবাসগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর বিশেষজ্ঞরা সর্বাত্মক গুরুত্বারোপ করেছেন।

এই জটিল পরিস্থিতিতে, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনা এবং এর পাশাপাশি প্রবাসীদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে এবং হুন্ডি বন্ধ করতে একদিকে যেমন আর্থিক প্রণোদনা ও সহজ ব্যাংকিং সেবার প্রয়োজন, তেমনি অন্যদিকে প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড শক্তিশালী রাখতে হলে এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...