জাতীয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের তাগিদ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের তাগিদ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের তাগিদ
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারত ও চীনসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কাজে লাগানোর ওপর সেমিনারে জোর দেওয়া হয়েছে।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ: জবাবদিহি, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যয়’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে আলোচকেরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কেবল কমিটি গঠনের পরিবর্তে প্রত্যাবাসনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ভারত, চীনসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বক্তারা।

ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর সেমিনারে বক্তব্য দেন। তিনি ক্যাম্প পরিদর্শন ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের আগ্রহ রয়েছে।

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর সরকারের গঠিত নতুন কমিটিকে স্বাগত জানান। তবে তিনি অতীতে বিভিন্ন কমিটি ও কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাই এই কমিটির কাজেরও নিয়মিত অনুসরণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

ফজলে এলাহী আকবর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকটকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ভারতের কালাদান প্রকল্পের নিরাপত্তা ও বাস্তবায়ন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই বিষয়টি কাজে লাগিয়ে ভারতকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরও সক্রিয় করা সম্ভব বলে ফজলে এলাহী আকবর মন্তব্য করেন। একইভাবে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উদ্যোগও বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে তিনি জানান।

বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেলও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, বর্তমানে মিয়ানমারের ভূখণ্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত এবং আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব রয়েছে।

মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল আরও বলেন, একই সঙ্গে মিয়ানমারকে ঘিরে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোর স্বার্থ বিদ্যমান। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা করে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক বা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, এই সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

অধ্যাপক সাহাব এনাম খান ব্যাখ্যা করে বলেন, মিয়ানমারের গুরুত্ব এখন বেড়েছে, বিশেষ করে মালাক্কা প্রণালির বিকল্প জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো, গ্যাস পাইপলাইন ও বন্দর ঘিরে। এর ফলে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্বার্থ তৈরি হয়েছে।

তিনি বাংলাদেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন, যার মূল লক্ষ্য হবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া প্রত্যাবাসন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের জন্য গঠিত নতুন কাঠামোকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সাহাব এনাম খান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের রাখার কথা না বলে তাদের প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও আরাকান আর্মির ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে সংকটটিকে সামগ্রিকভাবে দেখার কথা বলেন।

তিনি ক্যাম্পে অস্ত্র, মাদক, মানব পাচার ও সংঘাত বিস্তার ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। সীমান্ত দিয়ে মাদক ও মানব পাচার বন্ধ করা গেলে রোহিঙ্গাদের ঘিরে গড়ে ওঠা সংঘাতের অর্থনীতিও দুর্বল হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...