অ্যাঞ্জেলিনা জোলি পরিচালিত ‘উইদাউট ব্লাড’ ছবিতে সালমা হায়েক এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন যিনি শৈশবের ট্রমা থেকে প্রতিশোধ নাকি ক্ষমার পথে যাবেন তা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগেন।
হলিউডের নতুন সিনেমা ‘উইদাউট ব্লাড’ এক গভীর মানবিক দ্বন্দ্বের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে। এই ছবিতে প্রতিশোধ নাকি ক্ষমা, এই কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় কেন্দ্রীয় চরিত্রকে। কিছু ক্ষত শরীরে না থাকলেও সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়; এই ধারণাই সিনেমার মূল উপজীব্য। হারানোর বেদনা আর প্রতিশোধের আগুন বছরের পর বছর নীরবে জ্বলতে থাকে মনের গহিনে।
সময় তার ওপর প্রলেপ দিলেও স্মৃতিরা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয় না, বরং পুরোনো ক্ষত ফিরে আসে। ছোটবেলার বেদনা ও মুক্তির পথ খোঁজার এক নিরন্তর যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে। এই গল্পটি দর্শকদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় এক নৈতিক প্রশ্নের মুখে।
প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও নির্মাতা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন। ইতালীয় লেখক আলেসান্দ্রো বারিকোর উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাটি তৈরি হয়েছে। ‘উইদাউট ব্লাড’ ছবিতে কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান দেখানো হয়নি, যা এর সার্বজনীন আবেদনকে বাড়িয়ে তোলে এবং গল্পটিকে কালজয়ী করে তোলে।
ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র নিনা, যার জীবনে ছোটবেলার এক রক্তাক্ত অধ্যায় গভীর ক্ষত রেখে গেছে। মেক্সিকান অভিনেত্রী সালমা হায়েক এই সংবেদনশীল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার চরিত্রটি শৈশবের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ভার বহন করে চলেছে বহু বছর ধরে, যা তার বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করে।
‘উইদাউট ব্লাড’ সিনেমার শুরুতেই এক প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসক ম্যানুয়েল রোকার বাড়িতে ভয়াবহ হামলা দেখা যায়। কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি প্রতিশোধের নেশায় চিকিৎসক ও তাঁর পুত্রসন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই সহিংস ঘটনা ছোট্ট নিনাকে তার শৈশবেই একাকী ও আতঙ্কিত করে ফেলে, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
চিকিৎসকের ছোট্ট মেয়ে নিনা মেঝের কাঠের তক্তার নিচে লুকিয়ে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যায়। খুনিদের মধ্যে একজন, যার নাম টিটো, মেয়েটিকে দেখেও তাকে ছেড়ে দেয়। এই অপ্রত্যাশিত মানবিক মুহূর্তটি নিনাকে এক ভিন্ন পথে চালিত করে এবং তার ভবিষ্যতের জন্য এক জটিল বীজ বপন করে।
অনেক বছর পর মধ্যবয়স্ক নিনা সেই টিটোকে খুঁজে বের করে। তারা একটি রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি বসেন, যা সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। এই সাক্ষাৎ দীর্ঘদিনের পুরোনো ক্ষতকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে এবং এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে অতীত ও বর্তমান এক বিন্দুতে মিলিত হয়।
প্রতিশোধের জন্য আসা নিনা কি শেষ পর্যন্ত তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন, নাকি দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত স্মৃতিকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ছবিটি দর্শককে এক গভীর নৈতিক দ্বিধার মধ্যে ফেলে দেয়। এটি শুধু একটি প্রতিশোধের গল্প নয়, বরং ক্ষমা ও মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র।
সিনেমাটি কোনো সহজ উত্তর দেয় না, বরং দর্শককে গভীর ভাবনার খোরাক যোগায়। এটি প্রশ্ন তোলে যে, সহিংসতার প্রতিশোধ কি নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়? একজন মানুষ কি নিজের অতীতের বন্দিদশা থেকে কখনও মুক্ত হতে পারেন? এই প্রশ্নগুলো সিনেমার মূল বার্তা হিসেবে কাজ করে।
‘উইদাউট ব্লাড’ সিনেমায় সালমা হায়েকের অভিনয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। সাধারণত বাণিজ্যিক সিনেমায় তার প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী উপস্থিতিই বেশি আলোচিত হয়। তবে এই ছবিতে তিনি এক ভিন্ন রূপে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন এবং তার অভিনয় প্রতিভা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
সিনেমায় নিনাকে খুব বেশি সংলাপনির্ভর করা হয়নি। অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও নীরবতার মধ্য দিয়ে তার চরিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে, যা তার ভেতরের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলে। চায়ার কাপ নাড়ানো, ধূমপান কিংবা দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার মতো ছোট ছোট মুহূর্তেও তার অতীতের গভীর ভার অনুভব করা যায়, যা চরিত্রটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
আশ্চর্যজনকভাবে, সিনেমাটির শুরুতে সালমা হায়েক এ চরিত্রে অভিনয়ই করতে চাননি। পরে তিনি এই জটিল ও সংবেদনশীল চরিত্রটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার এই অভিনয় দক্ষতা সমালোচকদের কাছ থেকে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেছে এবং তাকে ভিন্ন ধারার অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মতামত (0)