সালমান শাহর মৃত্যু: তিন দশক পরও অমীমাংসিত রহস্যের জট খুলছে

সালমান শাহর মৃত্যু: তিন দশক পরও অমীমাংসিত রহস্যের জট খুলছে
সালমান শাহর মৃত্যু: তিন দশক পরও অমীমাংসিত রহস্যের জট খুলছে
জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যু রহস্য প্রায় ৩০ বছর পরও অমীমাংসিত। আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন করে হত্যা মামলার তদন্ত চলছে, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন।

প্রায় ৩০ বছর আগে দেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র জগতে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল। তার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, এই প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। দীর্ঘ তিন দশক ধরে তদন্ত, প্রতিবেদন, নারাজি ও আইনি লড়াইয়ের পর মামলাটি এখন নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তাধীন রয়েছে।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটে সালমান শাহর নিথর দেহ পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় তিনটি পৃথক তদন্তে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও, প্রথম থেকেই এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করে আসছে তার পরিবার। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের নির্দেশে মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।

২০ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে আদালতের নির্দেশের পর রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম তার সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে এই মামলা করেন। বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটির তদন্ত করছে।

মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সিআইডির আবেদনের প্রেক্ষিতে মে, ২০২৬ তারিখে আদালত সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দেয়। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করায় বিষয়টি এখন আদালতে নথিভুক্ত রয়েছে।

৯ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে ইমিগ্রেশন পুলিশ আটক করে। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং একই দিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে সিআইডি তার সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে।

২৭ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে আদালত আশরাফুল হক ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, রিমান্ড মঞ্জুর হলেও এখন পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। ৩০ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সিআইডি তা দিতে পারেনি।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

লন্ডন থেকে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী এবার তদন্ত শেষ হয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা করেছেন। তবে তিনি অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষ্য, আসামিরা দেশে অবস্থান করছেন এবং তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে; এরপরও কেন তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মৃত্যুর রহস্য বেরিয়ে আসবে।

মামলার বাদী সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুমের দাবি, সালমান শাহর মৃত্যুর সময় সামীরা, ডলি, মনোয়ার ও গৃহকর্মী আবুল বাসায় ছিলেন। তার মন্তব্য, সামীরাকে পুলিশ খুঁজে না পেলে তার সর্বশেষ স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তার অবস্থান জানা সম্ভব। আলমগীর কুমকুম আরও বলেন, আশরাফুল হক ডন তাদের মূল আসামি ছিলেন না; রিজভী নামে এক আসামির জবানবন্দিতে তার নাম আসে। তাদের মূল অভিযোগ সামীরা এবং তার মা-বাবাকে ঘিরে। তিনি সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার শেষ করার দাবি জানিয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর বেশি তথ্য দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় পর নতুন করে মামলা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাকি আসামিদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন এই আইনজীবী। অন্যদিকে, কারাগারে থাকা আশরাফুল হক ডনের আইনজীবী এম ফরিদুল ইসলাম মোবাইল ফোনে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় ২০ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে তার সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। বর্তমানে মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। গ্রেপ্তার হওয়া আশরাফুল হক ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও এখনো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ মারা গেলে তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়, যেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়।

ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর বাবা রিভিশন মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক, যেখানে হত্যার বিষয়টি নাকচ করা হয়। সালমান শাহের বাবার মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান।

২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে এরা জড়িত থাকতে পারে। এরপর মামলাটির তদন্তভার র‌্যাবের কাছে যায়। তবে ২১ আগস্ট, ২০১৬ তারিখে ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...