সাত কলেজ ঘিরে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভিন্নমত
সম্পাদক৩১ জুলাই, ২০২৬ · 68 দিন আগে
সাত কলেজ ঘিরে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভিন্নমত
ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে নিয়ে প্রস্তাবিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর অধ্যাদেশ ঘিরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছে।
ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজকে ঘিরে নতুন করে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। এসব কলেজকে একীভূত করে সরকার একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার কাঠামো নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে একটি অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করে, যেখানে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম 'ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি' রাখা হয়।
এই প্রস্তাবিত কাঠামোতে সাতটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠকেন্দ্র বা একাডেমিক ক্যাম্পাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিটি ক্যাম্পাসে আলাদা আলাদা বিষয়ে পাঠদান করার পরিকল্পনা ছিল। এই পরিকল্পনা প্রকাশের পর সাত কলেজের শিক্ষকেরা প্রস্তাবিত কাঠামোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নিজ নিজ কলেজে মানববন্ধন করেন।
শিক্ষকেরা জানান, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে নন, তবে তাঁরা মনে করেন, বর্তমান প্রস্তাবিত কাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলেজগুলোর উচ্চশিক্ষা ও নারী শিক্ষার সংকোচন হবে। এর ফলে কলেজের স্বতন্ত্র কাঠামো ও ঐতিহ্য বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের পদ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পৃথক স্থানে প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
অন্যদিকে, উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরাও প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনে বিক্ষোভ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় হলে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এই স্তর অস্তিত্বসংকটে পড়বে। এর বিপরীতে, কলেজগুলোর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে আগে থেকেই আন্দোলন করে আসছেন।
এই সাতটি কলেজ হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ। বর্তমানে এই কলেজগুলোতে দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী এবং হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। ইডেন ও তিতুমীর কলেজে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়, আর বাকি পাঁচটি কলেজে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং উচ্চমাধ্যমিক উভয় স্তর চালু আছে।
প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করে দেওয়ার জন্য গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান জানান, তাঁদের দায়িত্ব ছিল স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা এবং তাঁরা তা সম্পন্ন করেছেন। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অধ্যাদেশের খসড়া নিয়ে সাত কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দেওয়া যাবে এবং এরপর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একজন কর্মকর্তা এও বলেন যে, বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী কলেজগুলো আগামী কয়েক বছর চলবে।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে 'ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি' নামে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশে বলা হয়, ঢাকার সাতটি কলেজ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির 'সংযুক্ত কলেজ' হিসেবে থাকবে এবং কলেজগুলোর পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে। এই বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, চারুকলা এবং বিধি দিয়ে নির্ধারিত অন্যান্য 'স্কুল' থাকবে, যা মূলত অনুষদের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রমের ভিত্তিতে মেধাক্রম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বা সংযুক্ত কলেজগুলোর স্কুল বা ডিসিপ্লিনে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় 'হাইব্রিড' পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে, যেখানে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইনে এবং বাকিগুলো সশরীর হবে, তবে পরীক্ষা সশরীরই অনুষ্ঠিত হবে।
স্কুল অব সায়েন্সের আওতায় ঢাকা কলেজে ফলিত গণিত, প্রাণিবিদ্যা, ডেটা সায়েন্স, প্রাণরসায়ন ও জৈবপ্রযুক্তি; ইডেন কলেজে পদার্থবিদ্যা, ফলিত রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, ফরেনসিক সায়েন্স এবং বদরুন্নেসা কলেজে মনোবিজ্ঞান ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয় চালুর কথা অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়। স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিসের আওতায় বাঙলা কলেজে সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ অধ্যয়ন, উন্নয়ন অধ্যয়ন, অর্থনীতি, চলচ্চিত্র অধ্যয়ন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয় চালু করা যাবে। স্কুল অব বিজনেসের আওতায় তিতুমীর কলেজে হিসাববিজ্ঞান, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, হোটেল অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস, ব্যাংক অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স ম্যানেজমেন্ট এবং স্কুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিসের আওতায় কবি নজরুল কলেজে আইন এবং সোহরাওয়ার্দী কলেজে অপরাধবিজ্ঞান বিষয় চালু করার কথা বলা হয়।
২০১৭ সালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই সাত কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল, যা তখন থেকেই সংকট তৈরি করে। গত বছরের জানুয়ারিতে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবারও আলাদা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চূড়ান্ত করার আগেই অধিভুক্তি বাতিল করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বর্তমানে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষকে প্রশাসক করে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় সাত কলেজের কার্যক্রম চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারের শপথের ঠিক দুদিন আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্যও নিয়োগ করে যায়। নতুন শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি জানান, সাত কলেজ নিয়ে বিগত সরকারের কিছু 'তড়িঘড়ি' সিদ্ধান্ত ছিল কিনা, তা একটি কমিটি করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
মতামত (0)