স্বামী হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত স্ত্রী হাসিমুখে বললেন, ‘যত খুশি ভিডিও করেন, সবাই দেখুক’
সম্পাদক৩০ জুলাই, ২০২৬ · 69 দিন আগে
স্বামী হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত স্ত্রী হাসিমুখে বললেন, ‘যত খুশি ভিডিও করেন, সবাই দেখুক’
স্বামী হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত স্ত্রী বললেন, ‘যত খুশি মন চায় ভিডিও করেন, দেহুক সবাই’ | প্রথম আলো
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২: ১০
ময়মনসিংহে যুবলীগের কর্মী শফিকুল ইসলাম ওরফে সপুকে হত্যার দায়ে দ্বিতীয় স্ত্রী আফরোজা শেখ ইতিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহের বিশেষ দায়রা জজ আদালত
ময়মনসিংহে যুবলীগের কর্মী শফিকুল ইসলাম ওরফে সপু হত্যার দায়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আফরোজা শেখ ইতিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার দুপুরে এই রায় ঘোষণার পর আফরোজাকে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় তাঁকে বিমর্ষতার বদলে হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘যত খুশি মন চায় ভিডিও করেন, দেহুক সবাই।’
আদালত তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও দিয়েছেন, যা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ময়মনসিংহ বিশেষ দায়রা জজ ফারহানা ফেরদৌস আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। নিহত শফিকুল ইসলাম ওরফে সপুর বয়স ছিল পঁচিশ বছর।
রায় ঘোষণার পর নিহত শফিকুল ইসলামের মা ও মামলার বাদী নুরুন্নাহার গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলেন এবং আফরোজার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “চিন্তা কইরো না, আমি আবার আইতাছি। আবার আয়া খেলবাম।” নুরুন্নাহার আরও উল্লেখ করেন, তাঁর ছেলের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আফরোজা তিন দিন ধরে খোঁজাখুঁজির নাটক করেছিলেন। তিনি এই বিচার মানতে নারাজ এবং নিজেদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন।
আদালত ও মামলার নথি থেকে জানা যায়, নগরের বাঁশবাড়ী কলোনি এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম প্রথমে মাহমুদা আক্তারকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি ছেলেসন্তানও রয়েছে। পরে তিনি প্রথম বিয়ের বিষয়টি গোপন রেখে আফরোজা শেখকে বিয়ে করেন। আফরোজা যখন জানতে পারেন যে তাঁর স্বামী প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, তখন তাঁদের মধ্যে তীব্র কলহের সৃষ্টি হয়।
এই পারিবারিক কলহের জের ধরেই ২০১৯ সালের ১০ জুন আফরোজা শেখ এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ছক কষেন। তিনি স্বামীকে প্রায় ২০০টি ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করেন এবং এরপর ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। মরদেহটি কাঁথা দিয়ে পেঁচিয়ে বাড়ির পাশের একটি পচা পুকুরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রাখেন। এই নৃশংস ঘটনাটি এলাকার মানুষকে স্তম্ভিত করে তোলে।
ঘটনার তিন দিন পর স্থানীয় লোকজন পুকুরে মানুষের একটি হাত ভেসে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এই লোমহর্ষক আবিষ্কার এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শফিকুলের মা নুরুন্নাহার বাদী হয়ে ২০১৯ সালের ১৩ জুন ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় পুত্রবধূ আফরোজা শেখ এবং তাঁর বড় ভাই দীন ইসলামকে আসামি করা হয়। পুলিশ তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে আফরোজা শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. আকরাম হোসেন এবং আসামিপক্ষে আইনজীবী সাজ্জাদুর রহমান মামলাটি পরিচালনা করেন। আদালত মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রায়টি আসে, যা একদিকে ভুক্তভোগী পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও, অন্যদিকে তাদের পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে পারেনি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আকরাম হোসেন জানান, আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন যে আসামি একজন নারী এবং তাঁর একটি সন্তান রয়েছে। এই মানবিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। বিচারিক প্রক্রিয়া সবসময়ই আইনের কঠোরতা এবং মানবিকতার মধ্যে একটি ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করে।
তবে আফরোজা শেখের ভাই শেখ সাব্বির এই রায়ে সন্তুষ্ট নন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁর বোন হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন, বরং তাঁকে পরিকল্পিতভাবে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও শফিকুল ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে করায় তাঁদের সংসারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং তাঁর বোন নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
শেখ সাব্বির আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁর বোনের একটি সন্তান থাকার বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। তাঁরা শুরু থেকেই খালাস প্রত্যাশা করেছিলেন এবং এই কারণে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই আপিল প্রক্রিয়া মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সমাজে পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা এবং তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে একটি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে, অভিযুক্তের রায় পরবর্তী আচরণ সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তার নির্লিপ্ত হাসি এবং মন্তব্য, "আমি আবার আইতাছি। আবার আয়া খেলবাম," ভুক্তভোগীর পরিবারকে আরও বেশি শঙ্কিত করে তুলেছে।
এর আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় দলিল লেখক আবু জাকারিয়া (মিন্টু) হত্যা মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১০ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা ১৫ জুলাই ২০২৬-এ ঘোষণা করা হয়। সেই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন ৩০ হাজার টাকা জরিমানা এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। এই রায় শফিকুল হত্যা মামলার রায়ের সাথে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, যেখানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া, সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ ১২৮ বার পেছানোর ঘটনা দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকেও তুলে ধরে। শফিকুল হত্যা মামলার রায় তুলনামূলকভাবে দ্রুত আসলেও, ভুক্তভোগী পরিবারের অসন্তুষ্টি এবং আসামির উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা এই মামলার বিচারিক পথকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। এমন ঘটনাগুলো সমাজে বিচারিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এই ধরনের অপরাধমূলক ঘটনাগুলো পারিবারিক কলহ, প্রতারণা এবং তার থেকে জন্ম নেওয়া হিংসার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। আফরোজার মতো একজন নারীর এমন সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এবং রায় পরবর্তী তার নির্লিপ্ততা সমাজের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়েও গভীর আলোচনার জন্ম দেয়। এই মামলার ভবিষ্যৎ উচ্চ আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে, যা ভুক্তভোগী পরিবার এবং অভিযুক্ত উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
শেয়ার:
মতামত (0)
লোড হচ্ছে...
স্বামী হত্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত স্ত্রী হাসিমুখে বললেন, ‘যত খুশি ভিডিও করেন, সবাই দেখুক’ | বাংলানিউজবিডিহাব
মতামত (0)