আন্তর্জাতিকশি জিনপিংয়ের মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপ বর্জনের আহ্বান
শি জিনপিংয়ের মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপ বর্জনের আহ্বান
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার মিসরের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই আহ্বান জানান। এক দশক পর এটি ছিল তার কায়রো সফর।
শি জিনপিংয়ের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। বেইজিং এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আল-সিসির সঙ্গে বৈঠকে শি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই এই নীতি মেনে চলতে হবে যে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণই তাদের নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে হবে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে সংলাপ জোরদারে আঞ্চলিক দেশগুলোকে সমর্থন করতে হবে।’ মিসরের রাজধানী কায়রোর ইত্তিহাদিয়া প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি শি জিনপিংকে স্বাগত জানান। এ সময় শিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয়।
এরপর দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বৈঠকে বসেন। চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্য সফরে গেছেন শি জিনপিং। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতে বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর অঞ্চলটির মার্কিন মিত্ররা নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করছে। মিসর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। দেশটি ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা পায়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে কায়রো। শি জিনপিং আরও বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে মিলে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করতে প্রস্তুত চীন। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সংঘাতের কারণে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নেতা নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয় আরও জোরদারে সম্মত হয়েছেন। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর সরবরাহ শৃঙ্খলে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে। তারা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে পরস্পরের মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা মিসরের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বহুমুখী করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। শির সফরের আগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রেসিডেন্ট সিসি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার সময়ে মিসর ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ নীতি অনুসরণ করছে। সাবেক মিসরীয় কূটনীতিক আয়মান জেইনেলদিন বলেছেন, ‘চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে চায় মিসর।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফলে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি এক জায়গায় এসে মিলছে।’ অন্যদিকে চীনের জন্য মিসরের আঞ্চলিক প্রভাব ও কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক ভূমিকা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টায় কায়রোকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে বেইজিং।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেছেন, ‘বেইজিংয়ের কাছে মিসরের গুরুত্ব অনেক।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশটির বড় অভ্যন্তরীণ বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যুসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয়ে মিসরের যথেষ্ট কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ।’
গত মাসে চীন ও মিসরের যৌথ সামরিক মহড়ায় দুই দেশের বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ‘ঈগলস অব সিভিলাইজেশন’ নামের ওই মহড়ায় চীনের তৈরি জে-১৬ যুদ্ধবিমান এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের মধ্যে বিরল বিমানযুদ্ধের মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট সিসির চীন সফর এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে মিসরে চীনের বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে।
চীনা কোম্পানিগুলো কনটেইনার বন্দর, সবুজ হাইড্রোজেন প্রকল্প এবং লোহার পাইপ, গাড়ির টায়ার ও স্যাটেলাইট তৈরির কারখানায় কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। মিসরের মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। শির সফর ঘিরে কয়েক দিন ধরেই মিসরের রাজধানী কায়রোতে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যায়।
শহরের বিভিন্ন সড়ক চীনের পতাকা এবং মিসরের স্ফিংস ও চীনের গ্রেট ওয়ালের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি দিয়ে সাজানো হয়। সুয়েজ খাল ও ১১ কোটির বেশি জনসংখ্যার মিসর চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য আমদানি করেছে দেশটি।
মতামত (0)