শিক্ষক নিজে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে পাঠদান কার্যকর হয়: অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক

শিক্ষক নিজে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে পাঠদান কার্যকর হয়: অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক
শিক্ষক নিজে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে পাঠদান কার্যকর হয়: অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাক বলেছেন, শিক্ষক নিজে ভালোভাবে পড়ে পাঠদান করলে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দ্বিমুখী আলোচনা করলে শিক্ষা সবচেয়ে কার্যকর হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাক ৮৬ বছর বয়সেও শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা ও গবেষণাজীবনে তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, নন-মনোটনিক পটেনশিয়াল এবং নিউট্রন স্টারসহ পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল বিষয়ে গবেষণা করেছেন।

অধ্যাপক বসাক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর গবেষণা ও শিক্ষার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক কার্যক্রম চালুর ক্ষেত্রেও অবদান রাখেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পেয়েও তিনি দেশে ফিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার সময়েও তিনি পথিকৃতের ভূমিকা রাখেন। পাবনার রাধানগরে তার শৈশব, সংগ্রাম ও পারিবারিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে জীবনবোধের বিকাশ ঘটে। তিনি মনে করেন, জীবনসংগ্রাম মানুষকে বাস্তবতা উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়।

অধ্যাপক বসাকের সমাজ, দেশ ও মানবসম্পর্কিত বোধ শৈশবেই গড়ে উঠেছিল। মায়ের আদর্শ এবং পিতা-মাতার পারিবারিক শিক্ষায় তিনি দীক্ষিত হয়েছেন। তার বাবা ছোটবেলা থেকেই শেখাতেন যে, অন্যের ধর্ম, মত কিংবা বক্তব্যের মধ্যেও শিক্ষণীয় বিষয় থাকতে পারে।

একবার নামাজের ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলে তার বাবা বুঝিয়েছিলেন, নামাজের কিছু আসন শরীরের জন্যও উপকারী। সেদিন থেকেই তিনি বুঝেছিলেন যে, সব ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেও ভালো কিছু থাকতে পারে। রাধানগর মজুমদার অ্যাকাডেমি ও এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষা ও পরিবেশ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

অধ্যাপক বসাক মনে করেন, প্রতিকূলতা মানুষকে সাহসী, পরিশ্রমী, সৃজনশীল ও যুক্তিবাদী করে তুলতে পারে। তবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকলে সেই সংগ্রাম ধ্বংসাত্মক দিকেও যেতে পারে। তার জীবনে শুধু একজন শিক্ষক নয়, রাধানগর মজুমদার অ্যাকাডেমি, এডওয়ার্ড কলেজ ও রাজশাহী কলেজের অনেক আদর্শ শিক্ষক প্রভাব রেখেছেন।

রাধাবিনোদ বসাক স্যার তার নিষ্ঠা, সরল জীবনযাপন ও ছাত্রদের প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়ে তাকে প্রভাবিত করেছেন। এডওয়ার্ড কলেজের মাখনলাল চক্রবর্তী স্যার তার জীবনে বিশেষ প্রভাব রেখেছিলেন। তিনি উপদেশ দিতেন, "সারাদিন যা পড়বে, দিনের শেষে নিরিবিলি পরিবেশে বসে তা মনে মনে কল্পনা করে বোঝার চেষ্টা করবে। বুঝতে না পারলে আবার পড়বে ও চিন্তা করবে।"

অধ্যাপক বসাক এই উপদেশ সারাজীবন অনুসরণ করেছেন। মাখনলাল চক্রবর্তী স্যারের পড়ানোর ধরন ছিল অসাধারণ; তিনি কঠিন বিষয়ও সহজ ও প্রাণবন্তভাবে বোঝাতেন। রাজশাহী কলেজের প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান স্যারের কাছ থেকে তিনি নিষ্ঠা, সততা ও জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা পেয়েছেন।

অধ্যাপক বসাক বিশ্বাস করেন, আদর্শ ও লোভমুক্ত শিক্ষকই একটি জাতির বাতিঘর। একজন ভালো শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারেন। ১৯৬৩ সালে এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে তিনি পরদিনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

তিনি এমএসসি শ্রেণিতেই পড়ানো শুরু করেন। তার শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশ ছিলেন এক বছরের জুনিয়র এবং প্রায় ৬০ শতাংশ ছিলেন তার সহপাঠী কিংবা সিনিয়র। এমনকি একজন ছিলেন তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক।

অধ্যাপক বসাক বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলেন। তার মনে হতো, তিনি একজন প্রশিক্ষক এবং সবাই মিলে বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। ক্লাসে অনেক প্রশ্ন ও পাল্টা-প্রশ্ন হতো।

শিক্ষার্থীরা ক্লাসে তাকে সমীহ করলেও ক্লাসের বাইরে তারা ছিলেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। অধ্যাপক বসাক মনে করেন, শিক্ষক নিজে ভালোভাবে পড়ে তারপর পড়ালে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দ্বিমুখী আলোচনা করলে শিক্ষা সবচেয়ে কার্যকর হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...