রাজশাহীর এক শিক্ষকের মৃত্যুর পর চার বছর আগের একটি ডায়েরির পাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, যেখানে তিনি প্রধান শিক্ষককে দায়ী করেছিলেন। আজ শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে।
রাজশাহীর পুঠিয়াতে বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক সাহাদুল হক দুই দিন আগে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর চার বছর আগে লেখা একটি ডায়েরির পাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘হলফনামা’ শিরোনামের ওই লেখায় তিনি সম্ভাব্য মৃত্যুর জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে দায়ী করেছিলেন।
শিক্ষক সাহাদুল হকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা আজ বুধবার ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে প্রধান শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করে। শিক্ষার্থীরা জানায়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত না হলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি দেবে।
পুঠিয়া উপজেলার ধোপাপাড়া গ্রামে সাহাদুল হকের বাড়ি। দুই মাস আগে তিনি বানেশ্বর কাচারিপাড়ায় নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা সেখানে বসবাস করেন। বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়টি বানেশ্বর ইউনিয়ন সদরে অবস্থিত।
শিক্ষার্থীরা আজ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে। এরপর তারা বানেশ্বর বাজারে ঢাকা–রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে প্রায় ৩০ মিনিট যান চলাচল ব্যাহত হয়।
স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা পরে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাব্বির জানায়, সাহাদুল স্যার তাদের অত্যন্ত প্রিয় ও সদয় একজন মানুষ ছিলেন। স্যারকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছিল বলেও তারা শুনেছিল।
সাব্বির আরও জানায়, মৃত্যুর আগে ডায়েরিতে প্রধান শিক্ষকের নাম লিখে যাওয়া প্রমাণ করে স্যার কতটা নিরুপায় ছিলেন। তারা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের অবিলম্বে অপসারণ দাবি করে।
গত সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাহাদুল হকের মৃত্যু হয়। হাসপাতালের ডেথ রেজিস্টারে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘কার্ডিওরেসপাইরেটরি ফেইলিয়র’ উল্লেখ করা হয়েছে।
সাহাদুল হকের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী স্কুল থেকে বাসায় ফিরলে অনেক কষ্ট ও ভারাক্রান্ত মনে থাকতেন। প্রধান শিক্ষক তাঁর ওপর যে মানসিক চাপ দিতেন, তাতে তিনি হতাশ হয়ে ডায়েরিতে কথাগুলো লিখেছিলেন। অফিসে ডেকে নিয়ে গালাগালি করা হতো এবং অসুস্থতার সময়েও ছুটি দেওয়া হতো না।
শারমিন আক্তার বলেন, এসব কারণেই তাঁর স্বামী মারা গেছেন। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই, মৃত্যুর প্রায় চার বছর আগে, সাহাদুল হক তাঁর ডায়েরির পাতায় ‘হলফনামা’ শিরোনামে নিজের সম্ভাব্য মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ ও পরিস্থিতির কথা লিখে যান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়া, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক কিংবা অন্য কোনো কারণে তাঁর মৃত্যু হলেও বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাদ আলী ও তাঁর পরিবার দায়ী থাকবেন।
ডায়েরিতে আরও লেখা ছিল, বিদ্যালয়ের কোনো সহকারী শিক্ষকও যদি প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তিনিও দায়ী থাকবেন। এ বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক আজাদ আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহবুব সরকার বলেন, মানসিক টর্চার বিষয়টি আসলে আপেক্ষিক। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। কোন কথাটা কীভাবে কতটুকু বলা যাবে, তার তো কোনো প্যারামিটার নেই। তাই এটিকে নিপীড়ন বলা যাবে না।
মাহবুব সরকার জানান, তাঁরা শিক্ষক সাহাদুল হকের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরিবারের কোনো অভিযোগ নেই এবং তাদের দাবি, মৃত শিক্ষকের যে পাওনা আছে, সেগুলো যেন দ্রুত পরিশোধ করা হয়। তিনি দ্রুতই পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন বলে জানান।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লেখা চিরকুটের বিষয়ে সভাপতি বলেন, ২০২২ সালে সাহাদুল হক ওটা লিখেছিলেন। ফেসবুকে এটি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রধান শিক্ষকও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানিয়েছিলেন এবং তাঁর করণীয় জানতে চেয়েছিলেন। পরে এ নিয়ে তদন্ত হয়। সে সময় সাহাদুল হক বলেছিলেন, তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে এটা দিয়েছিলেন এবং তা ঠিক হয়নি।
পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান জানান, খবর পেয়ে তিনি ওই বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ের পরিবেশ স্বাভাবিক আছে। শিক্ষকের মানসিক নিপীড়নের অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
মতামত (0)