সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার কারণ ও প্রক্রিয়া

সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার কারণ ও প্রক্রিয়া
সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার কারণ ও প্রক্রিয়া
সমুদ্রে জলের নিয়মিত ওঠানামা, যা জোয়ার-ভাটা নামে পরিচিত, মূলত চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাবে ঘটে। পৃথিবীর ঘূর্ণন ও চাঁদের প্রদক্ষিণ এই প্রাকৃতিক ঘটনার সময় ও তীব্রতা নির্ধারণ করে।

সৈকতের উপকূলে দাঁড়িয়ে অনেকেই সমুদ্রের জলের নিয়মিত ওঠানামা লক্ষ্য করে থাকেন। কখনো সমুদ্রের জল তীরের দিকে এগিয়ে আসে, আবার কিছু সময় পর তা ধীরে ধীরে গভীর সমুদ্রের দিকে সরে যায়। সমুদ্রের জলের এই প্রাকৃতিক ও নিয়মিত ওঠানামাই জোয়ার-ভাটা নামে পরিচিত, যা বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলে একটি সাধারণ দৃশ্য।

বাংলাদেশের উপকূলসহ বিশ্বের অধিকাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে সাধারণত দিনে দুইবার উচ্চ জোয়ার এবং দুইবার নিম্ন ভাটা দেখা যায়। তবে জোয়ার-ভাটার নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন একই থাকে না, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। দুটি উচ্চ জোয়ারের ব্যবধান প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট হয়ে থাকে, যা এই প্রাকৃতিক চক্রের একটি নির্দিষ্ট অংশ।

এই সময় পরিবর্তনের মূল কারণ হলো চাঁদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ এবং পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘূর্ণন। এর ফলস্বরূপ, প্রতিদিন জোয়ারের সময় প্রায় ৫০ মিনিট করে পিছিয়ে যায়। স্থানীয় উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা, দ্বীপ, নদীমোহনা ও অন্যান্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতাকে প্রভাবিত করে থাকে।

পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার প্রধান কারণ হলো চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। তবে শুধু চাঁদই নয়, সূর্যের মহাকর্ষও এই প্রাকৃতিক ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চাঁদ পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে অনেক কাছে থাকায় জোয়ার সৃষ্টিতে তার প্রভাব সূর্যের চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়।

চাঁদ সমুদ্রের জলকে কোনো যান্ত্রিক শক্তি দিয়ে সরাসরি টেনে নেয় না; বরং চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভিন্ন মাত্রায় কাজ করে। চাঁদের সবচেয়ে কাছের পৃথিবীর অংশে এই আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি এবং দূরের অংশে তুলনামূলক কম থাকে। এই আকর্ষণ শক্তির পার্থক্যই সমুদ্রের পানির বণ্টনে পরিবর্তন ঘটায় এবং জোয়ারের সৃষ্টি করে।

পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। অন্যদিকে, সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। সূর্য চাঁদের তুলনায় অনেক বেশি ভরযুক্ত হলেও, এই বিশাল দূরত্বের কারণে জোয়ার সৃষ্টিতে তার প্রভাব চাঁদের চেয়ে কম হয়।

চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর সমুদ্রের পানির বণ্টনে এমন পরিবর্তন আনে যে পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানে একটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। একই সময়ে পৃথিবীর বিপরীত পাশেও আরেকটি জলস্ফীতি গঠিত হয়। এর ফলে পৃথিবীর দুই বিপরীত প্রান্তে জোয়ারের অঞ্চল সৃষ্টি হয়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, চাঁদের আলো সমুদ্রের পানিকে আকর্ষণ করে না। চাঁদের আলো প্রকৃতপক্ষে সূর্যের আলো, যা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সম্পর্কিত শক্তিটি হলো চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ।

চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সমানভাবে কাজ করে না। পৃথিবীর যে অংশটি চাঁদের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানে চাঁদের আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় ওই পাশের সমুদ্রের পানিতে একটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। অন্যদিকে, পৃথিবীর বিপরীত পাশে চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। পৃথিবী ও চাঁদের পারস্পরিক গতির কারণে সৃষ্ট জড়তার প্রভাবের সঙ্গে মহাকর্ষীয় পার্থক্যের ফলে বিপরীত পাশেও আরেকটি জলস্ফীতি তৈরি হয়।

পৃথিবী তার নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরতে থাকায় বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল এই দুটি জোয়ারি স্ফীতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। কোনো অঞ্চল যখন জোয়ারি স্ফীতির অংশে আসে, তখন সেখানে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে এবং জোয়ার দেখা যায়। আবার সেই অঞ্চল যখন দুটি জোয়ারি স্ফীতির মাঝামাঝি অপেক্ষাকৃত নিচু পানির অংশে চলে যায়, তখন ভাটা দেখা যায়।

তবে বাস্তব পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার বিষয়টি এতটা সরল নয়। মহাদেশের অবস্থান, উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা, উপসাগর, দ্বীপ এবং নদীর মোহনা সহ নানা প্রাকৃতিক বিষয় জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতাকে প্রভাবিত করে। এ কারণেই একই সময়ে পৃথিবীর সব জায়গায় জোয়ার দেখা যায় না।

পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট স্থানকে চাঁদের তুলনায় একই অবস্থানে আবার ফিরে আসতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগে। এই সময়কালকে চন্দ্রদিন বা লুনার ডে বলা হয়। কারণ, পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘোরার পাশাপাশি চাঁদও একই দিকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে, ফলে পৃথিবীকে চাঁদের তুলনায় একই অবস্থানে ফিরে আসতে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ মিনিট ঘুরতে হয়।

পৃথিবীতে দুটি জোয়ারি স্ফীতি থাকায় একটি উপকূলীয় অঞ্চল সাধারণত একটি চন্দ্রদিনে দুইবার এই স্ফীতির মধ্য দিয়ে যায়। এর ফলস্বরূপ, অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় দিনে প্রায় দুইবার উচ্চ জোয়ার এবং দুইবার নিম্ন জোয়ার পরিলক্ষিত হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...