বিরোধী দলের আপত্তির মুখে গতকাল জাতীয় সংসদে মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস হয়েছে। গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং মানবাধিকার কমিশনের নতুন কাঠামো বিলের মূল বৈশিষ্ট্য।
জাতীয় সংসদ বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের আপত্তি সত্ত্বেও তিনটি বিল পাস করেছে। গতকাল রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ সংসদে পাস হয়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন।
গত ২৭ আগস্ট বিল তিনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল। তখন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিলগুলো সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন। আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের বিভিন্ন ধারায় সংশোধনের সুপারিশ করে। আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলটিও সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটেও বিলগুলো পাস হলো। সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় মানবাধিকার, গণভোট ও গুমসহ বিভিন্ন বিষয়ে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশের আইনগত কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।
গতকাল বিল দুটি পাসের আগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। বিল দুটি দুর্বল আকারে আনা হয়েছে—এমন অভিযোগ করে বিল পাসের প্রক্রিয়া শুরুর আগমুহূর্তে সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এর আগে গত ২৭ আগস্ট বিল দুটি উত্থাপনের সময়ও বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল এবং পরে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির আলোচনাও বর্জন করে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকার ভুক্তভোগী জনগণ, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাসমূহের মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশ দুটি রহিত করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার চেয়ে দুর্বল ও সীমিত পরিসরের বিল আনা হয়েছে। মানবাধিকারসংক্রান্ত বিলে আইনের দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষ মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে মানবাধিকার কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিশেষ বিধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের দ্বৈত প্রয়োগ হতে পারে না। একই অপরাধে একজনের জন্য সরাসরি তদন্ত করা যাবে, আরেক জায়গায় আটকে পড়ে যাবে—এটা হতে পারে না। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা না থাকা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়।
‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য নয়—এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিলে গুম প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে। গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গুমের সাধারণ অপরাধের জন্য অন্যূন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বিলে গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারি কর্তৃপক্ষ বা শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কাউকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনোভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর তা অস্বীকার করলে অথবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন করলে এবং এর মাধ্যমে তাকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে। নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে। অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা তদন্তের অগ্রগতি জানার, ঘটনার সত্য উদঘাটনের এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার পাবেন। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে; তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র সেই ব্যয় বহন করবে।
গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা তাদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। বিলে গুমের ঘটনাগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার—উভয়ই সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে। তবে গুমের ঘটনা তদন্তে কোনো স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের বিধান রাখা হয়নি; তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই থাকছে। কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো বাহিনী কিংবা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার দিতে পারবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন। নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও তদন্ত চলাকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের বিধানও রাখা হয়েছে। এই আইনে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্ত করার ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি যদি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে (কিংবা বিপরীতভাবে) এবং স্বামী বা স্ত্রী যদি পরস্পরকে কোনো সম্পত্তি দান করেন, তবে দাতা তার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগদখলের অধিকার পাবেন।
মতামত (0)