সংসদে সারসংকট নিয়ে সরকারি-বিরোধী দলের তীব্র বিতর্ক
সম্পাদক৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · 1 ঘণ্টা আগে
সংসদে সারসংকট নিয়ে সরকারি-বিরোধী দলের তীব্র বিতর্ক
জাতীয় সংসদে সারসংকট নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। সরকারি দল মজুতের পর্যাপ্ততার দাবি করলেও, বিরোধী দল বিতরণ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে।
জাতীয় সংসদে সারসংকট নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন ডিলার নিয়োগসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল অভিযোগ করেছে যে সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে এবং কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না।
আজ বৃহস্পতিবার বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের দেওয়া নোটিশের ওপর আলোচনায় এই বিতর্ক শুরু হয়। নাজিবুর রহমান কার্য প্রণালিবিধির ৬৮ বিধিতে ‘দেশজুড়ে তীব্র সারসংকটে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া; কৃষকদের মাঝে বিরাজমান আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ বিষয়ে আলোচনার জন্য নোটিশটি দিয়েছিলেন।
সারসংকট নিয়ে সরকারের দাবির বিষয়ে নাজিবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জ্বালানিসংকট শুরু হওয়ার সময়ও বলা হয়েছিল দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই, তাই এখন সরকারের দাবি বিশ্বাস করা কঠিন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
নাজিবুর রহমান অভিযোগ করেন, সার কারখানাগুলো বন্ধ রেখে জনগণের টাকায় বেশি দামে সার কেনা হচ্ছে। সরকার মজুত থাকার কথা বললেও, তা কৃষকদের হাতে পৌঁছাতে পারছে না, যা সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণ করে। তিনি জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটের মতো সারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিপর্যয় দেখছেন বলে মন্তব্য করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে একজন সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দেশ নাকি সারে ভাসছে, এমন দাবি করা হচ্ছে। তবে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যের চেয়েও বেশি দামে সার পাচ্ছেন না। তিনি এই প্রতিবেদনটি কোনো বিরোধী দলের বানোয়াট নয় বলেও মন্তব্য করেন।
শফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সারসংকটের মধ্যে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গুদাম ভর্তি রয়েছে। তিনি ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন। তার মতে, এটি ২০০১-২০০৬ সালের লক্ষণ, যখন এক বস্তা সারের জন্য কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছিল।
আরেক সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম তার বক্তব্যে বলেন, চলমান সারসংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। সরকারের দাবি অনুযায়ী অতিরিক্ত সার মজুত থাকলে কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না এবং কেন তাঁদের কালোবাজারে যেতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তিনি রাখেন।
মাহবুবুল আলম কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীতে কৃষকদের গুদাম লুটের ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের অসন্তোষের কথা সংসদে তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, সারের মজুত থাকার পরও কৃষকদের মধ্যে যে হাহাকার তৈরি হয়েছে, তা সরকারের ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে। তিনি কালোবাজারি রোধ, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এই বিতর্কে অংশ নিয়ে সরকারি দলের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অনেক ডিলার এখনো বহাল আছেন এবং অনেকে পলাতক। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি সারের ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বিতরণে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্বৈরাচার আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা বিভিন্নভাবে সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। তবে এটি আর সম্ভব হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
মীর শাহে আলম ইউরিয়া, টিএসপি এবং ডিএপি সারের মজুতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে মজুত অনেক বেশি। তিনি আরও জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং মিয়ানমারে সারের দাম বেশি হওয়ায় কিছু সার সেখানে পাচার হওয়ার প্রবণতার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে। এ ধরনের দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার মজুত আছে বলেই কৃষকেরা আগামী মৌসুমের জন্য সার কিনতে পারছেন। কৃষি বিভাগ ও সরকার প্রত্যেক জেলায় অতিরিক্ত সার মজুত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিনও সরকারি দলের পক্ষে আলোচনায় অংশ নেন। তিনি বলেন, সার ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ইতিমধ্যে অনেক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সুলতান সালাউদ্দিন আরও বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলের ডিলারদের পরিবর্তনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন শূন্য পদে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আবেদনের সময় শেষ হওয়ার আগেই অহেতুক অনিয়মের অভিযোগ তোলা অবান্তর। তিনি পত্রপত্রিকায় আসা সারসংক্রান্ত ২০-২২টি বিশেষ এলাকার ছোটখাটো সমস্যাগুলোকে ভিত্তি করে অসন্তোষ ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন। তিনি সাবোটাজ না করে জনগণের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান।
শেয়ার:
মতামত (0)
লোড হচ্ছে...
সংসদে সারসংকট বিতর্ক: সরকারি-বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ | বাংলানিউজবিডিহাব
মতামত (0)