স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি
জুলাই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো জনপ্রতিনিধিহীন হয়ে পড়ায় নির্বাচন কমিশন আসন্ন নভেম্বর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) আসন্ন নভেম্বর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জুলাই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার সিটি করপোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলর, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। পরবর্তীতে এসব স্থানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও সরকার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, তবে এসব প্রতিষ্ঠানও প্রায় দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।

দেশের বেশিরভাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়ায় গা ঢাকা দিয়েছেন বা কারাগারে রয়েছেন। এই জনপ্রতিনিধিহীনতার কারণে স্থানীয় সরকারের প্রান্তিক এই অংশটি স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন নেতৃত্বাধীন কমিশন জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থার গতি ফেরাতে এই বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন আয়োজনে কাজ করছে। ইসি এরই মধ্যে নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে। স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূল ইউনিট ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন প্রথমে অনুষ্ঠিত হতে পারে। দ্রুত ভোট গ্রহণের জন্য কমিশন অগ্রিম মালামাল কেনাকাটা সম্পন্ন করেছে।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজার ছোট হোসিয়ান ব্যাগ ও গানি ব্যাগ এবং ৭৫ হাজার বড় হোসিয়ান ব্যাগ অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, ১৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিং সিল এবং ৮ লাখ ৪০ হাজার অফিসিয়াল সিলসহ অন্যান্য সামগ্রী কেনা আছে। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, কেনাকাটার দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে সংসদ নির্বাচনের সময়ই বাড়তি মালামাল সংগ্রহ করা হয়েছিল।

পুরো স্থানীয় সরকার নির্বাচন কাগজের ব্যালট পেপারে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা বিষয়ে কঠোর আইনি সংস্কার আনার প্রস্তাব কমিশন পর্যায়ে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।

স্থানীয় সরকারের সব স্তরের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউপি, উপজেলা ও জেলা পরিষদ) আইনে সামঞ্জস্য আনতে একাধিক সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব হলো ঋণখেলাপিদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেও প্রার্থীরা আগের ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপির দায় থেকে মুক্ত হবেন না এবং অযোগ্য ঘোষিত হবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক, ঋণখেলাপি এবং খেলাপি ঋণের জামিনদাররা প্রার্থী হতে পারবেন না।

লাভজনক পদ এবং নৈতিক স্খলনের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রজাতন্ত্র, সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ বা সরকারের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার থাকা কোম্পানিতে সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত পদকে ‘লাভজনক পদ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। চাঁদাবাজি, চুরি, আত্মসাৎ, ধর্ষণ, হত্যা ও দুর্নীতিকে ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ’ হিসেবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। নির্ভরশীল ব্যক্তির সংজ্ঞায় প্রার্থীর স্বামী/স্ত্রী এবং প্রার্থীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, ভাই ও বোনকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অপরাধে কঠোর শাস্তি ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আগের ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র সংজ্ঞায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কমিশন বা অনুমোদিত সংস্থা থেকে লিখিত অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা সংস্থাই কেবল ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষক’ হিসেবে গণ্য হবেন। নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিচারিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে এবং মতদ্বৈততা এড়াতে আপিল ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কমিশন নিজস্ব প্রস্তুতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকেও আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে বলছে।

এরই অংশ হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার গত ১৮ আগস্ট পুলিশ মহাপরিদর্শক, ১৯ আগস্ট আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক এবং ২৪ আগস্ট বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...