পরিবেশতাপপ্রবাহকে দুর্যোগ ঘোষণার দাবি, জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আহ্বান
তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ ঘোষণার দাবি, জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা তীব্র তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল এক পরামর্শ সভায় তারা চরম তাপমাত্রার স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন।
দেশে চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। এর প্রভাবে মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা, জীবিকা ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তীব্র তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং একটি সমন্বিত জাতীয় তাপপ্রবাহ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল শনিবার জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ সেন্টার এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর আয়োজিত এক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সভায় এই আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম সভায় সভাপতিত্ব করেন। জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ সেন্টারের ট্রাস্টি ড. এস এম মোর্শেদ সভাটি সঞ্চালনা করেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। মূল প্রবন্ধে ড. মল্লিক বলেন, চরম তাপমাত্রা এখন মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং জীবিকার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৩৫ দিন দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
ড. মল্লিক আরও বলেন, বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া, দ্রুত নগরায়ণ এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের খোলা জায়গায় কাজ করার কারণে তাপজনিত ঝুঁকি বাড়ছে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রবেশের সীমিত সুযোগ এবং অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, কৃষিশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক ও হকাররা চরম তাপের কারণে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তিনি জানান, অতিরিক্ত তাপের কারণে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন পেশাগত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা জোরদার, কর্মস্থলে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার স্থাপন, নগর সবুজায়ন ও ‘কুল রুফ’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি পর্যবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন।
সভায় চরম তাপের অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ সেন্টারের ট্রাস্টি ড. এস এম মোর্শেদ জানান, বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপজনিত উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১ দশমিক ৮ থেকে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশের সমপরিমাণ।
তিনি আরও বলেন, এই ক্ষতির প্রভাব রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। চরম তাপের কারণে ঢাকায় বছরে প্রায় ৩ শতাংশ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা ক্ষতির সঙ্গে তুলনীয়। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার ক্ষতি ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
ড. মোর্শেদ সতর্ক করে বলেন, তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া মিলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হারাতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, চরম তাপের প্রভাব মোকাবিলায় খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কৃষি, পরিবহন, নির্মাণ ও পোশাক খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকি আলাদাভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি তা সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত ও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে তাপের ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে ঝুঁকির মানচিত্র প্রণয়ন, আবাসিক ভবনে তাপ কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্যোগের স্থায়ী আদেশাবলিতে তীব্র তাপকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু আবহাওয়াজনিত সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, শ্রম অধিকার, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। তাই মৌসুমি বা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এই পরামর্শ সভায় জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, শ্রমিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মতামত (0)